সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরের ভারসাম্য পরিবর্তন করে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেছেন, সরকারি চাকরির নিয়োগে ভাইভার নম্বর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বিএনপি সরকারের নির্লজ্জ দলীয়করণের অশুভ ইঙ্গিত।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে তিনি এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরিতে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সমান ৫০ নম্বর রাখার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সরকারের বড় আকারে ভাইভার নম্বর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রশাসনকে দলীয়করণের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের হাতিয়ার হতে পারে বলে দেশবাসী মনে করে।
তিনি আরো বলেন, লিখিত পরীক্ষা একজন প্রার্থীর জ্ঞান, মেধা, বিশ্লেষণী সক্ষমতা ও প্রস্তুতিকে তুলনামূলকভাবে বস্তুনিষ্ঠভাবে যাচাইয়ের সুযোগ দেয়। লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র সংরক্ষণ, পুনর্মূল্যায়ন ও অডিট করা সম্ভব। অন্যদিকে মৌখিক পরীক্ষার মূল্যায়ন বেশির ভাগই বোর্ডের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ও বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল। ফলে ভাইভার নম্বরের ওজন অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হলে মেধার ব্যবধান কৃত্রিমভাবে পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং লিখিত পরীক্ষায় অর্জিত মেধা ও যোগ্যতার অবমূল্যায়ন ঘটবে।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, বর্তমান সরকার রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে ভয়াবহ দলীয়করণ শুরু করেছে। ইতোমধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসনসহ সচিবালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দলীয় বিবেচনায় মেধাহীন, অযোগ্য ও বিতর্কিত লোকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এসব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় লোকদের নিয়োগ দিয়ে সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
জামায়াতের এই নেতা বলেন, বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা। অথচ সরকারি চাকরির নিয়োগব্যবস্থায় এমন একটি বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যা মেধার মূল্যায়নকে দুর্বল করে নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতির পথ উন্মুক্ত করবে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের পদগুলোতে দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী প্রতিযোগিতা করেন। তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন প্রস্তুতি নিয়ে সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যে কঠোর পরিশ্রম করে পরীক্ষায় অংশ নেন। এমন কোনো অনিশ্চিত ব্যবস্থার ওপর তাদের মেধা ও পরিশ্রমের মূল্যায়ন ছেড়ে দেয়া উচিত নয়, যেখানে মৌখিক পরীক্ষার অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে লিখিত পরীক্ষার ফলাফল পরিবর্তন করা সম্ভব।
তিনি বলেন, প্রক্সি, জালিয়াতি ও পরীক্ষায় অনিয়ম প্রতিরোধ করা জরুরি। তবে জালিয়াতি বন্ধের অজুহাতে ভাইভার নম্বর বাড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না। প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষাব্যবস্থা, বায়োমেট্রিক যাচাই, পরীক্ষাকেন্দ্রে কঠোর নজরদারি, প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, ডিজিটাল মনিটরিং ও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে অনিয়ম প্রতিরোধ করা সম্ভব।
তিনি আরো বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণ সরকারি চাকরি ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে অতীতে গড়ে ওঠা দলীয়করণের অবসান চেয়েছে। নতুন কোনো পদ্ধতিতে পুরোনো দলীয়করণের সুযোগ তৈরি করা উচিত নয়। প্রশাসনে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর পরিচয় হবে তার মেধা, যোগ্যতা, সততা ও কর্মদক্ষতা; কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নয়।
মিয়া গোলাম পরওয়ার সরকারের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগে ভাইভার নম্বর বৃদ্ধির বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। একইসাথে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি, অর্থের লেনদেন ও সুপারিশের সংস্কৃতি বন্ধ করে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে শতভাগ স্বচ্ছ নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে পুরোনো বৈষম্য, দলীয়করণ ও অনিয়মের পুনরাবৃত্তি জনগণ মেনে নেবে না। তরুণ সমাজের মেধা, শ্রম ও ন্যায্য অধিকার রক্ষায় সরকারকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।



