১১ দলের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ আজ

গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ ৬ দফা দাবি

দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সঙ্কট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সঙ্কীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ। লংমার্চের বহরে প্রায় দেড় হাজার গাড়ি যুক্ত হবে জানিয়ে ১১ দলের নেতারা আশা করছেন তাদের এ কর্মসূচি ঘিরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে জনতার ঢল নামবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ প্রস্তুতির সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন মিয়া গোলাম পরওয়ার
চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ প্রস্তুতির সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন মিয়া গোলাম পরওয়ার |নয়া দিগন্ত

গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন ও জুলাই গণহত্যার বিচারসহ ছয় দফা দাবিতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ আজ। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সঙ্কট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সঙ্কীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ। লংমার্চের বহরে প্রায় দেড় হাজার গাড়ি যুক্ত হবে জানিয়ে ১১ দলের নেতারা আশা করছেন তাদের এ কর্মসূচি ঘিরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে জনতার ঢল নামবে।

জানা যায়, সরকারের ছয় মাসের মধ্যেই দেশে নানামুখী সঙ্কট দেখা দিয়েছে। গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে ৭১ ভাগ ভোট পড়লেও সংবিধান সংস্কার না করে সংশোধন করায় বিরোধী দল আপত্তি জানিয়েছে। সংসদে সরকারের গঠিত এ সংক্রান্ত কমিটিতে থাকার আহবান জানালেও প্রত্যাখ্যান করেছে তারা। এ ছাড়া সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই দেশে জ্বালানি সঙ্কট প্রবল আকার ধারণ করেছে। ক্ষমতায় না বসতেই তেল পাম্পগুলোতে গাড়ির দীর্ঘলাইন সামাল দিতে হয়েছে। বর্তমানে বাসায় একদিকে বিদ্যুতের লোডশেডিং তীব্র আকার ধারণ করেছে অন্যদিকে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে নাগরিকরা। গ্যাসসঙ্কটে সিএনজি চালিত গাড়ির দীর্ঘলাইন লেগেছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। এ ছাড়া সারসঙ্কটে দিশেহারা দেশের কৃষকরা। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধিতে নাভিশ্বাস উঠেছে দেশবাসীর। এর পাশাপাশি সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি, অহরহ খুন-ধর্ষণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। ২৪ এ ছাত্ররা যে কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে হাসিনা সরকারকে উৎখাত করেছে নতুন সরকার আসার শুরুতেই সেই কোটা আর দলীয়করণকে বেছে নিয়েছে। স্থানীয় সরকারের সব পদে কোনো নির্বাচন ছাড়াই দলীয় নেতাদের বসানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি থেকে শুরু করে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় নেতাদের স্থান দেয়া হয়েছে।

এজন্য এসব সমস্যা নিরসনে ছয় দফা দাবিতে এতদিন বিভিন্ন বিভাগীয় পর্যায়ে সমাবেশের পর এবার লংমার্চের কর্মসূচি দিয়েছে ১১ দল। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী আজকের লংমার্চের মাধ্যমে এ কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। এরপর পর্যায়ক্রমে আরো কয়েকটি বিভাগীয় শহরমুখী লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে।

জামায়াত সূত্রে জানা যায়, লংমার্চের সামগ্রিক প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আজকে লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশ সকাল ৭টায় রাজধানীর শাপলা চত্বরে অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে একঘণ্টা সমাবেশ শেষে সকাল ৮টায় চট্টগ্রামের দিকে ছুটে চলবে গাড়িবহর। লংমার্চের বহরে প্রায় দেড় হাজার গাড়ি যুক্ত হওয়ার আশা করছে ১১ দল। লংমার্চের রুটে বিভিন্ন পয়েন্টে পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। প্রথমটি নারায়ণঞ্জের কাঁচপুর ব্রিজের কাছে ট্রাকস্ট্যান্ডে, এরপর কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, ফেনীর মহীপাল, মিরসরাই এবং সবশেষ চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে জনসভা অনুষ্ঠিত হবে। লংমার্চে অংশগ্রহণকারী ডেলিগেটরা গাড়ি থেকে নেমে পথসভায় যোগ দেবেন না। পথসভায় স্থনীয় শাখা বাস্তবায়ন করবে। বহরে থাকা গাড়িতে স্টিকার থাকবে এবং চলমান থাকা অবস্থায় কোনো গাড়ি বহরের সাথে যুক্ত হতে পারবে না। যুক্ত হবে বহরের শেষে। সংবাদ প্রচার করার জন্য গাড়ি বহরের সাথে গণমাধ্যমের গাড়ি যুক্ত হবে। লংমার্চে জনতার অংশগ্রহণ বাড়াতে জামায়াত নেতাদের গত কয়েক দিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ করতে দেখা গেছে। এ কর্মসূচিতে বিপুল সংখ্যক জনগণের অংশগ্রহণের প্রত্যাশা করছে ১১ দল।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত যে খবর পেয়েছি সেখানে জনতার ঢল নামবে। তিনি আরো বলেন, সরকার গঠনের ছয় মাস পার হলেও গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়নি। বরং গণরায় বাস্তবায়ন করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তবে আমাদের স্পষ্ট কথা হচ্ছে গণভোটের গণরায়ে কোনো নোট অব ডিসেন্ট নেই। গণভোটে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট খারিজ হয়েছে। আমরা জুলাই বিপ্লবের রক্তের বিনিময়ে একসাথে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছি। আমরা সরকার উৎখাতের কোনো আন্দোলন করছি না, জনগণের ও আমাদের দাবি হলো গণভোটের গণরায়কে আপনারা মেনে নেন। আমাদের ছয় দফা আপনারা মেনে নিন। আমরা প্রত্যাশা করি, আমাদের কর্মসূচিকে সম্মান দেখিয়ে সরকার জনগণের আস্থায় থাকবে।

লংমার্চ বাস্তবায়নে গতকাল ১১ দলীয় ঐক্যের সর্বশেষ প্রস্তুতি বৈঠক রাজধানীর মগবাজারের জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে এক ব্রিফিংয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকারে গঠনের পর বিরোধী দল জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে সংসদের ভিতরে ও বাইরে এখনো নিয়মতান্ত্রিক, গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। সরকারের প্রতি আমাদের অনুরোধ বিরোধী দলের সর্ববৃহৎ শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিকে সফল করতে সব প্রশাসনিক সহযোগিতা দিয়ে আস্থায় থাকবেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি সরকারের কোনো দল বা কেউ লংমার্চে কোনো প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করে তাহলে তারা জনগণের আস্থা হারাচ্ছেন, আরো হারাবে এবং জনরোষের মুখোমুখি হবে। আশা করি এরকম কোনো অপরিণামদর্শী পথে সরকার ও সরকারি দলের কেউ পা বাড়াবে না।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরে প্রমাণিত হোক বিরোধী দল ও সরকারি দলের পরমতসহিষ্ণুতা রয়েছে এবং রাজনৈতিক সহিংসতা যে ছিল সেই নেতিবাচক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছি। আমরা এখন পর্যন্ত কোনো নাশকতার আশঙ্কা করছি না। নিরাপদ শান্তিপূর্ণ লংমার্চে জনগণের জানমালের ক্ষয়ক্ষতির কোনো কারণ নেই। গোলাম পরওয়ার বলেন, পুলিশ প্রশাসনের মহাপরিদর্শককে ১১ দল লিখিতভাবে কর্মসূচির বিষয়ে অবহিত করেছে। রাস্তার দু’ধারে হাজার হাজার জনগণ লংমার্চকে অভিবাদন জানাবে।

দেশবাসী ও দলের নেতাকর্মীদেরও ধৈর্য, সাহস ও শৃঙ্খলার সাথে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চ সফল করার জন্য সর্বাত্মকভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

বৈঠকে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসাইন মিয়াজী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা আবদুল মাজেদ আতহারী, এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব আব্দুল্লাহ আল মামুন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা: মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার সহসভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম, জাগপার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইকবাল হোসাইন, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, নির্বাহী পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, মোবারক হোসাইন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন প্রমুখ।