আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের সাথে গণতন্ত্র যায় না। ওরা মুখে বলেছে সবসময় গণতন্ত্রের কথা, কিন্তু কাজটা করেছে উল্টো। যে কারণে গণতন্ত্র এখানে কখনোই টেকসই হতে পারেনি।’
‘এখন টেকসই গণতন্ত্রের জন্য তো যেসব দেশগুলোতে গণতন্ত্র আছে—পাশ্চাত্যে হাজার বছর লেগেছে, আমরা তো একটুতেই অস্থির! আমাদের আজকে পাঁচ মাস হয়নি সরকারের, এখনই বলছি যে সরকার ব্যর্থ! তো এটাকে আপনি গণতন্ত্রের কোন জায়গায় ফেলবেন?— এমন প্রশ্ন রাখেন তিনি।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিল আয়োজিত ‘টেকসই গণতন্ত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা আসলে ভীষণ রকমের অসহিষ্ণু। এই অসহিষ্ণুতা নিয়ে কখনো গণতন্ত্রকে টেকসই করা সম্ভব হবে না। আমরা বারবার কথা বলছি যে, গণতন্ত্রের আরেকটা বিষয় আছে, সেটা হচ্ছে টলারেন্স (সহনশীলতা)—যে আমি অন্যের কথা শুনব এবং সেটা যদি ঠিক হয়, সেটাকে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করব। আমি তার সাথে একমত নই, কিন্তু তার কথাটা যেন সে বলতে পারে, সেই পরিবেশটা তৈরির জন্য আমি সবকিছু করব। এই তো কথাটা!’
‘কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই কাজগুলো আমাদের এখানে খুব কম হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা তো আশা করেছিলাম যে একটা চমৎকার টেকসই গণতন্ত্র এখানে হবে। কিন্তু ঠিক উল্টোটা হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব তো আওয়ামী লীগকে নিয়ে এই দেশে একটা চরম দুঃশাসন ও গণতন্ত্রবিরোধী স্বৈরাচারী শাসন চালিয়ে গেছেন, শেষ পর্যন্ত একটা একদলীয় শাসন ব্যবস্থায় চলে গেছেন। পরবর্তীতে আসেন এরশাদ সাহেব। তিনিও নষ্ট করে গেছেন,’ বলেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেছে শেষ ১৫ বছর। শেখ হাসিনা গণতন্ত্রের নাম করে একদম গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছেন এবং গণতন্ত্রের প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেছেন। আজকে যে সমস্যাগুলো দেখছেন, এই সমস্যাগুলোর প্রধান কারণটাই হচ্ছে যে এখানে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি, কোনো ইনস্টিটিউশন ডেভেলপ করেনি।’
লেখালেখি নিয়ে আগের মতো খারাপ পরিবেশ নেই উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, “কেউ আপনাদের বলেননি, ‘এটা কেন লিখলেন বা এটা লিখলেন না কেন?’ কেউ তো আপনাকে তুলে নিয়ে যাবে না বা আয়নাঘরে দিয়ে দেবে না! ‘রাইট দ্য ট্রুথ’ (সত্য লিখুন)।”
তিনি বলেন, ‘যারা গণতন্ত্রকে টেকসই করতে চাই, প্রথম কথা হচ্ছে—সেই গণতন্ত্রকে টেকসই করার জন্য এটাকে আমাদের চর্চা করতে হবে। আমরা যারা গণতন্ত্রের জন্য কাজ করছি, গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করছি, সংগ্রাম করছি—তিন মাস-চার মাস গেল না, আমরা এখন রাস্তায় নেমে গেছি! রাস্তায় নেমে আমরা বলছি যে সরকার ব্যর্থ, এই মুহূর্তে পদত্যাগ করতে হবে! বলছি যে পাঁচ বছর যেতে দেব না, একদম ফ্যাসিস্টদের ভাষায়, আওয়ামী লীগের ভাষায় কথা বলছি, হাসিনার ভাষায় যে—পাঁচ বছর যেতে দেব না, আগেই শেষ করে দেব! তো এই ভাষাগুলো তো গণতন্ত্রের ভাষা নয়। আপনি পার্লামেন্টে আসেন, পার্লামেন্টে কথাগুলো বলেন। বলা হয়েছে পার্লামেন্টের কথা। আপনার জুলাই সনদ নিয়ে কথা আছে, গণভোট নিয়ে কথা আছে—এগুলো পার্লামেন্টে সমাধান করা যায়। কিন্তু দেখুন, আমাদের যারা গণতন্ত্রের কথা বলি, যুদ্ধ করি, সংগ্রাম-লড়াই করি—আমরাই তো এটা মানতে চাই না! আমরা বেরিয়ে গেছি যখন, মব ক্রিয়েট করে জোর করে যাওয়ার চেষ্টা করছি। ভয়ঙ্কর ভাষা! যে ভাষাগুলো আমরা ব্যবহার করছি, সেগুলো কিন্তু একদম হাসিনার ভাষার সাথে আমি কোনো পার্থক্য দেখি না।’
প্রশ্ন রেখে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এই ভাষা নিয়ে যদি কথা বলতে থাকি, তাহলে গণতন্ত্র কোথায় হবে, কীভাবে হবে? আপনারা দেখুন, কিছুদিন আগে প্রধান অতিথির একটা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ছিল—রাষ্ট্রের একটা অনুষ্ঠান। সেখানে একটা মিস্টেক বা ভুল হতে পারে, ভুল তথ্য থাকতে পারে। বিষয়টা নিয়ে কথা বলা যেতে পারে, কিন্তু তার জন্য একে বিশ্রী একটা অবস্থা তৈরি করা, ইন দ্য প্রিজেন্স অফ দ্য ডিপ্লোম্যাটস (কূটনীতিবিদদের উপস্থিতিতে) যে অবস্থা তৈরি করা হলো—এটা কখনোই গণতন্ত্রের জন্য উপযোগী নয়, এটা গণতন্ত্র হতে পারে না।’
সাংবাদিকদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের কোনো অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে, ইউনিয়নের পক্ষ থেকে, সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে জোরালো ভাষায় এগুলোর বিরুদ্ধে কোনো কথা বলতে শুনিনি! কিছু মনে করবেন না, বাস্তবতা বলছি। আপনাদের মধ্যেই তো সমস্যাটা। এই সমস্যাটা একটু আপনারা দয়া করে এক হন, আপনাদের নিজেদের স্বার্থে। গণমাধ্যম তখনই ভালো ভূমিকা পালন করতে পারবে, যদি আপনারা যারা এর মধ্যে কাজ করছেন, তারা এক হয়ে যান। তা না হলে এটা হবে না। ওয়েজ বোর্ড নেই, কথা নেই—বিদায় করে দিচ্ছে, সেটাই করে দিচ্ছে। কোনো মিনিমাম স্যালারি নেই। তো এটা নিয়ে তো কোনো আন্দোলন নেই আপনাদের, কথাও নেই! সবাই আমরা ইগনোর করে যাই, আমরা এই সমস্যার কাছ থেকে দূরে সরে যাই।’
তিনি বলেন, ‘সরকারকেও অবশ্যই আপনারা সবসময় চোখে চোখে রাখবেন। সরকার ভুল করছে—সেটা তুলে ধরবেন, কিন্তু তাকে সময়ও দিতে হবে।’
মির্জা ফখরুল বলেন, “আমি সেদিন দেখলাম একটা টকশো হচ্ছে কোনো একটা ইলেকট্রনিক চ্যানেলে। ‘সরকারের ব্যর্থতার চার মাস’—টকশোর হেডলাইন! এতে বোঝা যায় যে মিডিয়া কীভাবে একদিকে নিয়ে যেতে চায়, ওই পার্টিকুলার মিডিয়া। এটা তো ঠিক না। কিন্তু কেউ বলে না যে ‘সরকারের চার মাসের অর্জন কী, সাফল্য কোথায়?’ এই কথাটা নিয়ে কিন্তু কেউ আলোচনা করলেন না! আর টকশোতে আলোচনা শুনলে মনে হয় যে, এই সরকার চরম ব্যর্থ, সব শেষ হয়ে গেছে, এখানে কিছু নেই! তো এই যে মানসিকতা! আর এখন দেখবেন, আপনাদের চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে এসেছে সোশ্যাল মিডিয়া। এটা আরো ভয়ঙ্কর! এক মুহূর্তে সব ডেস্ট্রয় (ধ্বংস) করে দিতে পারে। একটা মানুষের সারা জীবনের অর্জন একটা ছোট্ট রিল তৈরি করে ব্যাস, শেষ করে দিল! এই প্রবণতা চলে এসেছে।”



