বিএনপি সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমে সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার চিত্রই বেশি বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, সরকার গণভোটের রায় কার্যকর না করে প্রত্যাখ্যান করেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সঙ্কট, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাত, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে ‘বিএনপি সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়ন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই সনদের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু গণভোটের রায় সরকার কার্যকর করেনি। এটি সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। গণভোট নিয়ে সরকারের এমন অবস্থানে জাতি ও বিশ্ববাসী বিস্মিত।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সঙ্কটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এ সঙ্কটের কারণে দেশের উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে এবং প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন। সমস্যা সমাধানে বিরোধী দল সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিলেও সরকার তা বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
শিক্ষা ও প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে জামায়াতের এই নেতা বলেন, সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় লোক নিয়োগ দিচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তার অভিযোগ, সরকারি চাকরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততাই এখন যোগ্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি অফিসগুলো বিএনপি নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা ছাত্রদলকে সমর্থন করায় ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা ফিরছে না। এর ফলে শিক্ষাঙ্গনে নৈরাজ্য তৈরি হচ্ছে এবং ছাত্রদল ক্রমেই সহিংস হয়ে উঠছে।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে গোলাম পরওয়ার বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সঙ্কট ও খেলাপি ঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, রাজস্ব ঘাটতি এবং ব্যাংকনির্ভর ঋণ গ্রহণ অর্থনীতির বড় সঙ্কট। ডলারের বিনিময় হার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যের দামের অস্থিরতার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে। একই সাথে বিদেশী বিনিয়োগ ও রপ্তানি কমছে এবং প্রবৃদ্ধিও তলানিতে নেমেছে।
নিত্যপণ্যের বাজার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখার উদ্যোগেরও সমালোচনা করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, চাকরিবিধি মেনে রাজনীতি করা প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনীতি থেকে বিরত রাখার কোনো আইন বা বিধি সরাসরি সংবিধানবিরোধী।
বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বাধা দেয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বিরোধী দলের এমপিদের ওপর সরকারি দলের সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের তদারকির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। নির্বাচিত এমপিদের বরাদ্দ না দিয়ে তাদের কাজে হস্তক্ষেপ করা সংবিধানবিরোধী এবং এমপিদের অধিকারে হস্তক্ষেপের শামিল।
জনপ্রশাসনের বিষয়ে তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের মতাদর্শের অনুসারী নন—এমন সৎ কর্মকর্তাদের ওএসডি করা, পদোন্নতি না দেয়া ও অযথা বদলি করা হচ্ছে। একই সাথে আওয়ামী লীগের অনুসারী কর্মকর্তাদের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পদায়ন ও পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে।
সরকারের ইতিবাচক দিক হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্থিতিশীলতা ধরে রাখার প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, এটিকে সরকারের কৃতিত্ব বলা যাবে না। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের কারণেই রিজার্ভে স্থিতিশীলতা এসেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না সরকার ব্যর্থ হোক।’ জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সংসদ ও রাজপথে বিরোধী দল দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবে। সরকারকে সহযোগিতার অংশ হিসেবে হরতাল কিংবা জ্বালাও-পোড়াওয়ের পথে না যাওয়ার কথাও বলেন তিনি।
গণভোটের রায় না মানার বিষয়ে সরকারকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে উল্লেখ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। গণমাধ্যম যেন নিরপেক্ষভাবে সত্য তুলে ধরে, সেটিই তাদের প্রত্যাশা।
বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর জামায়াতের ছয় নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। দলীয় এমপিদের ওপরও সরকারি দলের নেতাকর্মীরা হামলা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আমরা রাজনীতিতে সঙ্ঘাত চাই না। দেশকে শান্তির দিকে নিতে চাই।’ এ জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধরার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ (সাবেক এমপি) ও মাওলানা আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, আবদুর রব ও অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মুহাম্মদ জাহিদুর রহমান প্রমুখ।



