জাতীয় কৃষক শক্তি

খুচরা বিক্রিব্যবস্থা বাতিল হলে সার বিতরণে ডিলারকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট গড়ে উঠবে

জাতীয় কৃষক শক্তি বলছে, যথাযথ স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে পুরনো মধ্যস্বত্বভোগী কাঠামোর পরিবর্তে নতুন ডিলার সিন্ডিকেট তৈরি হতে পারে। রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় সুপারিশ, স্বজনপ্রীতি কিংবা অর্থনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে একই গোষ্ঠীর হাতে ডিলারশিপ কেন্দ্রীভূত হলে কৃষকের জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রতীকী ছবি

সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা ব্যবস্থা বাতিল করা হলে সার বিতরণে ডিলারকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে জাতীয় কৃষক শক্তি। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এই কৃষক সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, একটি ইউনিয়ন বা পৌরসভার মাত্র তিনজন ডিলার যদি রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি, অর্থনৈতিক ক্ষমতা কিংবা পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন, তাহলে তারা স্থানীয় সিন্ডিকেটে পরিণত হতে পারেন। এতে সারের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে কৃষককে অতিরিক্ত দামে সার কিনতে বাধ্য করার সুযোগ তৈরি হবে এবং বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা নষ্ট হবে।

বুধবার সার সঙ্কট নিরসন এবং ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৫ (সংশোধিত)’ বাস্তবায়নে কৃষকের স্বার্থ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে দেয়া এক যৌথ বিবৃতিতে এ আশঙ্কা প্রকাশ করেন জাতীয় কৃষক শক্তির আহ্বায়ক সাঈদ উজ্জ্বল ও সদস্যসচিব কৃষিবিদ গোলাম মর্তুজা সেলিম।

বিবৃতিতে বলা হয়, কৃষকের কাছে সঠিক সময়ে, নির্ধারিত মূল্যে ও সহজলভ্যভাবে সার পৌঁছে দেয়া কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম পূর্বশর্ত। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রণীত সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণ নীতিমালা বর্তমান সরকার সংশোধন করেছে। সংশোধিত নীতিমালায় একই পরিবারের একাধিক ডিলারশিপের সুযোগ রহিত করা এবং ইউনিয়ন ও পৌরসভায় ডিলার ইউনিট পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে জাতীয় কৃষক শক্তি। তবে সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে সংগঠনটি।

জাতীয় কৃষক শক্তি বলছে, যথাযথ স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে পুরনো মধ্যস্বত্বভোগী কাঠামোর পরিবর্তে নতুন ডিলার সিন্ডিকেট তৈরি হতে পারে। রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় সুপারিশ, স্বজনপ্রীতি কিংবা অর্থনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে একই গোষ্ঠীর হাতে ডিলারশিপ কেন্দ্রীভূত হলে কৃষকের জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

সংগঠনটির মতে, সংশোধিত ব্যবস্থায় একটি ইউনিয়ন বা পৌরসভায় সর্বোচ্চ তিনজন ডিলার থাকার সুযোগ রয়েছে। এ তিনজনের মধ্যে সমঝোতা হলে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় সুপারিশের পরিবর্তে যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতাকে একমাত্র ভিত্তি করার দাবি জানিয়েছে জাতীয় কৃষক শক্তি।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় সার সঙ্কট ও সরবরাহ ঘাটতির অভিযোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। বিবৃতিতে বলা হয়, সারের সঙ্কট কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার দ্রুত সরবরাহ, মজুত ও বিতরণব্যবস্থার তদারকি এবং কৃত্রিম সঙ্কট ও কালোবাজারি বন্ধে সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

জাতীয় কৃষক শক্তি মনে করে, সারের বরাদ্দ একটি ওয়ার্ডের চলমান ফসলের চাহিদার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা উচিত। নির্দিষ্ট ওয়ার্ডের কৃষক যেন সেই ওয়ার্ডের ডিলার পয়েন্ট থেকেই সার সংগ্রহ করতে পারেন, সে ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

সার বিতরণব্যবস্থা পুরোপুরি ডিজিটালাইজ করারও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। বিবৃতিতে বলা হয়, স্মার্ট কৃষি কার্ডে কৃষকের জমির পরিমাণ ও সারের চাহিদার তথ্য যুক্ত করা হচ্ছে। তাই একটি নির্দিষ্ট সফটওয়্যারের মাধ্যমে দেশের যেকোনো ডিলারের কাছে কত সার সরবরাহ করা হয়েছে, কতটুকু মজুত রয়েছে এবং কোন কৃষক কত পরিমাণ সার কিনছেন—এসব তথ্য দৃশ্যমান করতে হবে। এতে কোনো ডিলারের পক্ষে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করা কঠিন হবে।

একইসাথে দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে সার বিক্রি করে আসা বিপুলসংখ্যক খুচরা বিক্রেতার জীবিকার বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে জাতীয় কৃষক শক্তি। যোগ্য পুরনো খুচরা বিক্রেতাদের নতুন ব্যবস্থায় অনুমোদিত বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে অগ্রাধিকার দেয়ার দাবি জানানো হয়েছে। যারা নতুন ব্যবস্থায় থাকতে পারবেন না, তাদের স্বল্পসুদে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করারও প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। বিদ্যমান দোকান ও অবকাঠামোকে ‘কৃষক সেবাকেন্দ্র’ হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ দেয়ার কথাও বলা হয়েছে।

সারের দাম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতীয় কৃষক শক্তি জানিয়েছে, সরকারি হিসাবে ডিএপি সারের দাম ১ হাজার ৫০ টাকা হলেও বিভিন্ন এলাকায় তা ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

ডিলারদের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ারও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি, মজুত করে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি কিংবা কৃষককে হয়রানি করলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। কোনো ডিলারের বিরুদ্ধে অনিয়ম প্রমাণিত হলে অবিলম্বে ডিলারশিপ বাতিলের বিধান নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।

সাব-ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে কৃষকদের অগ্রাধিকার দেয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে জাতীয় কৃষক শক্তি। তাদের মতে, আগ্রহী ও যোগ্য কৃষকদের সাব-ডিলার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলে একদিকে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা বাড়বে, অন্যদিকে কৃষকের সারপ্রাপ্তির সুযোগও সহজ হবে।

আসন্ন আমন মৌসুমে সার সঙ্কটের আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে সংগঠনটি। ডিলারশিপ পুনর্বণ্টনকে কেন্দ্র করে বাজারে অরাজকতা তৈরি হলে আমন উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে তারা মনে করছে। তাই ডিলারশিপ পুনর্বণ্টনের সময় আমন মৌসুমে সার সরবরাহ কিভাবে নির্বিঘ্ন রাখা হবে, সে বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা জনগণের সামনে প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে।