এস এম মিন্টু, পার্বত্যাঞ্চল থেকে ফিরে
বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্ত সংযোগস্থলে গড়ে উঠেছে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি, ইউপিডিএফ ও কুকি চিনের অভিন্ন নেটওয়ার্ক। মিয়ানমারের চিন ও রাখাইন রাজ্য থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম সীমান্ত রুট ব্যবহার করে দেশে ঢুকছে আধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ, যা সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা ও শান্তিচুক্তির স্থিতিশীলতাকে বড় ঝুঁকিতে ফেলেছে।
এক দিকে মিয়ানমার, অন্য দিকে ভারত সীমান্ত। তিন দেশের সীমান্ত সংযোগস্থলে সম্প্রতি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর এক নজিরবিহীন ও উদ্বেগজনক সামরিক মেরুকরণ সৃষ্টি হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির সীমান্তে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি, বান্দরবানের কুকি চিন, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফ-এই তিন আলোচিত সশস্ত্র সংগঠন পাহাড়ের পরিস্থিতিকে ভয়ঙ্কর করতে এক মঞ্চে জোট বেঁধেছে। ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ আনানেয়ার ক্ষেত্রে ত্রিদেশীয় সীমান্ত এখন ‘ডেঞ্জার জোনে’ পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে পাহাড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর লাগাতার অভিযানের মুখে ইউপিডিএফ তাদের কৌশল পাল্টে অন্যান্য দেশবিরোধী ও বিদেশী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাথে হাত মেলাতে শুরু করেছে। সম্প্রতি মিয়ানমারভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি এবং বান্দরবানের পার্বত্য অঞ্চলের নব্য সন্ত্রাসী সংগঠন কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সাথে ইউপিডিএফের গভীর গোপন আঁতাতের খবর পাওয়া গেছে। গত ২৮ জুন রুমা-বিলাইছড়ি সীমান্তবর্তী রেতলাং পাহাড়ে কেএনএফের ঘাঁটিতে ইউপিডিএফের উপস্থিতি এবং পরবর্তীতে সেনা অভিযানে তাদের এই নতুন সমঝোতা প্রকাশিত হয়।
আঞ্চলিক গোয়েন্দা সংস্থা ও সীমান্ত সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, কৌশলগত অবস্থান মজবুত করা, অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনার জন্য এই তিন গোষ্ঠী একটি ‘ত্রিপক্ষীয় অঘোষিত অক্ষ’ গড়ে তুলেছে। এরই মধ্যে এই তিন গোষ্ঠীর মিয়ানমার-বাংলাদেশ ও ভারতের মিজোরামে অবাধ যাতায়াতের তথ্য গোয়েন্দাদের কাছে এসেছে। আগামী মাসে অর্থাৎ সেপ্টেম্বরে তারা নতুনভাবে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক ভয়ঙ্কর অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সীমান্তে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টির পরিকল্পনা করেছে। ভয়ঙ্কর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মিয়ানমার থেকে বান্দরবান সীমান্তবর্তী এলাকা এবং ভারত থেকে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি এলাকায় ভারী অস্ত্রের মজুদ গড়ছে এই তিন সশস্ত্র সংগঠন। সম্প্রতি পার্বত্যঞ্চলে সরেজমিন গিয়ে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সূত্র ও গোয়েন্দা তথ্য বলছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের প্রভাবশালী বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ), পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এবং গোপন সশস্ত্র সংগঠন কেএনএফ বা কুকি চিন সদস্যরা একজোট হয়ে কাজ করছে।
এই সমন্বিত জোটের ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য সীমান্ত এবং মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই ত্রিদলীয় আঁতাত কেবল একটি সাধারণ জোট নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চলের মানচিত্র ও নিরাপত্তা সমীকরণ বদলে দেয়ার এক গভীর নীল-নকশা।
যেভাবে গড়ে উঠল ত্রিপক্ষীয় অক্ষ : দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নভাবে সক্রিয় থাকা এই তিন গোষ্ঠীর আদর্শগত ভিন্নতা থাকলেও ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে তারা এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। রাখাইনে জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ের পর আরাকান আর্মি এখন বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্তের দিকে তাদের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে চাইছে।
অন্য দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে কোণঠাসা হয়ে পড়া কুকি চিন বা কেএনএফ এবং রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ির পাহাড়ে সক্রিয় ইউপিডিএফ নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা ও সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক মিত্রের সন্ধান করছিল।
সূত্র জানায়, গত বছরের শেষভাগ থেকে মিয়ানমারের চিন স্টেট এবং রাখাইনের সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এই তিন গোষ্ঠীর শীর্ষ নেতাদের মধ্যে একাধিক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আরাকান আর্মি এই জোটের ‘বড় ভাই’ বা প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছে। তারা ইউপিডিএফ এবং কুকি-চিনকে উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র, বিস্ফোরক এবং আধুনিক গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। বিনিময়ে বাংলাদেশ সীমান্তের দুর্গম পাহাড়ি রুটগুলো ব্যবহার করে আরাকান আর্মির জন্য ভারী অস্ত্র গোলাবারুদ ও চোরাচালানের নিরাপদ করিডোর নিশ্চিত করছে স্থানীয় এই দুই গ্রুপ।
অস্ত্রের জোগান ও রুট নিয়ন্ত্রণ : গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এই জোটের প্রধান লক্ষ্য হলো অস্ত্রের অবাধ চোরাচালান রুট সচল রাখা। মিয়ানমারে উৎপাদিত অবৈধ অস্ত্র ও ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে আসা আধুনিক স্বয়ংক্রিয় রাইফেল এখন আরাকান আর্মির হাত ঘুরে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করছে। কুকি চিন এবং ইউপিডিএফের পাহাড়ি গোপন আস্তানাগুলোকে আরাকান আর্মি তাদের ট্রানজিট ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করছে।
খাগড়াছড়ির দুর্গম সীমান্ত এবং সাজেক ভ্যালির ওপারে মিয়ানমারের চিন স্টেটের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে এই তিন বাহিনীর যৌথ টহল এবং ক্যাম্প স্থাপনের খবরও পাওয়া গেছে। এর ফলে সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে একক কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ এক এলাকায় অভিযান হলে বিদ্রোহীরা সহজেই অন্য গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সীমান্ত পার হয়ে আশ্রয় নিচ্ছে।
ভারতের চিকেনস নেক ও বাংলাদেশের পার্বত্য নিরাপত্তার সঙ্কট : সশস্ত্র জোটটির প্রভাব কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মিজোরাম ও মনিপুরের নিরাপত্তাকেও বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলেছে। কুকি চিন জনগোষ্ঠীর সাথে ভারতের মিজোরামের জাতিগত সংযোগ রয়েছে। আবার আরাকান আর্মি ভারতের ‘কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট’ প্রকল্পের জন্য বড় হুমকি।
বাংলাদেশী ভূখণ্ডে ইউপিডিএফ এবং কুকি চিনের সাথে আরাকান আর্মির এই দহরম-মহরমের কারণে বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলা- রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে দীর্ঘস্থায়ী অশান্তি সৃষ্টির আশঙ্কা করা হচ্ছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদন আভাস দিচ্ছে যে, এই তিন গ্রুপ মিলে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বায়ত্তশাসন বা সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি অঞ্চলের দাবি তোলার জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে লবিং করার যৌথ পরিকল্পনা করছে।
জান্তা সরকারের পতন ও আরাকান আর্মির উচ্চাকাঙ্ক্ষা : মিয়ানমারের রাখাইনে জান্তা সরকারের পরাজয়ের পর আরাকান আর্মি এখন কার্যত ওই রাজ্যের শাসক। তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং অর্থনৈতিক করিডোর সচল রাখতে তাদের বাংলাদেশ সীমান্ত সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। তারা ভালো করেই জানে, বাংলাদেশ সরকারকে চাপে রাখতে হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। ইউপিডিএফ এবং কুকি চিনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে আরাকান আর্মি আসলে বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর একটি স্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে রাখছে।
মাইকেল চাকমাসহ অন্যদের ভূমিকা : ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমার বিরুদ্ধে রয়েছে চাঁদাবাজির মামলায় ৮ বছরের সাজা। অপরাধের এক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তিনি। পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করতে নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের উসকানিমূলক মন্তব্য করেন যাতে সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়ে। অন্য দিকে ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বিভাগের নেতা সজিব চাকমা, কেন্দ্রীয় চিফ কালেক্টর রবি চন্দ্র অর্কিড ও আত্মগোপনে থাকা কুকি চিনের প্রধান নাথান বম পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে রেখেছেন। এখানে সেনাবাহিনী না থাকলে হয়তো এতদিনে বাংলাদেশ-ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত বলতে আর কিছুই থাকত না। পুরোটাই ভারতের মধ্যে চলে যেত, নয়তো তাদের স্বপ্নের ‘জুম্মল্যান্ড’ হয়ে যেত। এর সাথে যোগ হয়েছে মিয়ানমারের আরেক সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি।
ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলো ইউপিডিএফের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বলে দীর্ঘদিনের জনশ্রুতি ও প্রমাণ রয়েছে। ইউপিডিএফ সভাপতি প্রসীত বিকাশ খীসা, সাধারণ সম্পাদক রবি শংকর চাকমা, কেন্দ্রীয় সদস্য উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমা, কেন্দ্রীয় সহসভাপতি নতুন কুমার চাকমাসহ প্রথম সারির শীর্ষ নেতারা বাংলাদেশে বহু মামলার হুলিয়া মাথায় নিয়ে ভারতে আত্মগোপন করে আছে। সরকারের পক্ষ থেকে এবং আদালত থেকে ইউপিডিএফের শীর্ষ নেতৃত্বকে একাধিকবার আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়া হলেও এবং তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং ও চাঁদাবাজির গুরুতর মামলায় সাজা হওয়া সত্ত্বেও তারা সীমান্তের ওপারে বসে নিজেদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও করণীয় : ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) মোহাম্মদ আলী শিকদার বলেন, এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য ঢাকাকে অবিলম্বে বহুমাত্রিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ সেনা বাহিনীকে পার্বত্য অঞ্চলে তাদের অপারেশনাল সক্ষমতা আরো বাড়াতে হবে এবং সীমান্ত নজরদারিতে ড্রোন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে ভারতের সাথে রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় জোরদার করা জরুরি। কারণ এই তিন গোষ্ঠীর তৎপরতা দুই দেশের জন্যই সমান বিপজ্জনক। তিনি বলেন, কূটনৈতিক স্তরে আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা ‘ইউনাইটেড লিগ অব আরাকানে’র (ইউএলএ) ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে। যাতে তারা বাংলাদেশের ভেতরের কোনো সন্ত্রাসী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় না দেয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) রোকন উদ্দীন বলেন, আরাকান আর্মি, ইউপিডিএফ এবং কুকি চিনের এই অশুভ আঁতাত পার্বত্য অঞ্চলের শান্তি চুক্তির চেতনাকে ধূলিসাৎ করে দেয়ার শামিল। সময়মতো এই ত্রিদলীয় অক্ষকে ভেঙে দেয়া না গেলে, অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত একটি আন্তর্জাতিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে, যা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।



