১০ দিনব্যাপী পিসিএসডি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প সম্পন্ন

মেধা, দক্ষতা ও নৈতিকতার সমন্বয়ে দুর্নীতিমুক্ত কল্যাণরাষ্ট্র গড়ার আহ্বান ছাত্রশিবিরের

১০ দিনব্যাপী এ আয়োজনে মেধা ও মননের মূল্যায়নে আত্মপরিচয় প্রদান, বিতর্ক, দেয়ালিকা প্রকাশসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মোট ৭৯টি পুরস্কার প্রদান করা হয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক
ছাত্রশিবিরের ১০ দিনব্যাপী পিসিএসডি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প সম্পন্ন
ছাত্রশিবিরের ১০ দিনব্যাপী পিসিএসডি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প সম্পন্ন |ছবি : নয়া দিগন্ত

মেধা, দক্ষতা ও নৈতিকতার সমন্বয়ে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তুলে দুর্নীতিমুক্ত ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতৃবৃন্দ। ২০২৬ সালের এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ের জনশক্তিদের নিয়ে আয়োজিত ১০ দিনব্যাপী ‘প্রি-কলেজ স্কিলস ডেভেলপমেন্ট ট্রেনিং ক্যাম্প (পিসিএসডি) ২০২৬’ সমাপনী অনুষ্ঠানে এ আহ্বান জানানো হয়।

গত ২১ আগস্ট থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুরে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কলেজ বিভাগের উদ্যোগে এ প্রশিক্ষণ ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক হাফেজ ইউসুফ ইসলাহীর পরিচালনায় আয়োজিত ক্যাম্পের মূল প্রতিপাদ্য ছিল—‘সততা ও দূরদর্শিতায় ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে শক্তিশালী করা’ (Empowering Future Leaders with Integrity and Vision)।

কলেজ জীবনের বৃহত্তর শিক্ষাঙ্গনে প্রবেশের আগে শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক, ভাষাগত ও প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ করে তোলার লক্ষ্যে আয়োজিত ক্যাম্পে প্রতিদিন ইংরেজি ও কম্পিউটারের ওপর মোট ৪০টি ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়। এর পাশাপাশি কোরআন তেলাওয়াত, বিষয়ভিত্তিক স্টাডি সেশন, মোটিভেশনাল ক্লাস ও ইনোভেটিভ গেমসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বিকাশে গুরুত্ব দেয়া হয়।

সমাপনী ও অন্যান্য সেশনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে নেতৃবৃন্দ আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্যের আলোকে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান আত্মশুদ্ধির ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘আধুনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রযুক্তিগত ও একাডেমিক দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি, আত্মিক পবিত্রতা ও স্রষ্টার সাথে গভীর সম্পর্ক ছাড়া প্রকৃত সফলতা অর্জন সম্ভব নয়। একজন আদর্শ ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের মধ্যে সঠিক চরিত্র এবং সঠিক দিকনির্দেশনা—দুটিরই সমন্বয় প্রয়োজন।’

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম বলেন, জিপিএ-৫ অর্জন আপনাদের জীবনের একটি গৌরবময় মাইলফলক হলেও এটি চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। ‘সততা ও দূরদর্শিতায় ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে শক্তিশালী করা’—এই প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে আপনাদের জ্ঞান, দক্ষতা এবং নৈতিক দৃঢ়তার সমন্বয় ঘটাতে হবে। আগামীর ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে আপনাদেরকেই সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে।

সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসাইন ‘সম্ভাবনার বাংলাদেশ’ বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, ‘আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনার একটি দেশ। এই দেশের মানবসম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠন সময়ের ব্যাপার মাত্র। আপনাদের মতো মেধাবী তরুণদের সততা ও দূরদর্শিতার সাথে নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে, যাতে আগামী দিনে দেশের যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে আপনারা সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারেন।’

সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘কেবল ভিশন বা দূরদর্শিতা থাকলে নেতৃত্ব উচ্চাকাঙ্ক্ষী হতে পারে, কিন্তু নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হলে তা ভুল পথে পরিচালিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই দূরদর্শিতার পাশাপাশি সততা ও নৈতিক দৃঢ়তায় বলীয়ান হয়ে আপনাদের সঠিক পথে এগিয়ে যেতে হবে।’

ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে আপনাদের মতো মেধাবীদেরই হাল ধরতে হবে। মেধা ও যোগ্যতার সাথে যদি সততা এবং দূরদর্শিতার সমন্বয় ঘটে, তবেই একটি দুর্নীতিমুক্ত ও সমৃদ্ধশালী কল্যাণরাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব হবে।’

ক্যারিয়ার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ এবং পরিবর্তনশীল কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতায় আগামী দিনের নেতৃত্বকে হতে হবে জ্ঞাননির্ভর এবং উদ্ভাবনী। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে আপনাদেরকে দেশ ও জাতির কল্যাণে এমনভাবে ক্যারিয়ার গড়তে হবে, যেন আপনাদের ব্যক্তিগত সাফল্য বৃহত্তর সমাজের কল্যাণে অবদান রাখে।’

সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা বলেন, ‘মেধা ও দক্ষতা মানুষকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়, কিন্তু সেই সক্ষমতার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন নৈতিক চরিত্র। তাই আমাদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে এমনভাবে গড়ে উঠতে হবে, যেখানে মেধা ও দক্ষতার সাথে নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের এক অপূর্ব সমন্বয় থাকবে।’

সমকালীন ইতিহাসের সাথে তরুণ প্রজন্মের সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে ক্যাম্পের অংশগ্রহণকারীদের চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের চারজন বীর শহীদ—শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ ওসমান হাদী, শহীদ আলী রায়হান এবং ফয়সাল আহমেদ শান্ত—এর নামে চারটি সাব-গ্রুপে ভাগ করে পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

১০ দিনব্যাপী এ আয়োজনে মেধা ও মননের মূল্যায়নে আত্মপরিচয় প্রদান, বিতর্ক, দেয়ালিকা প্রকাশসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মোট ৭৯টি পুরস্কার প্রদান করা হয়।

সমাপনী দিনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা বায়তুল মোকাররমে ফজর আদায় শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শহীদ মিনার, জাতীয় সংসদ ভবন ও জাতীয় জাদুঘরসহ গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শন করেন। পরে সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে সনদপত্র ও পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে ১০ দিনব্যাপী এ আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।