বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, ১১ দলীয় ঐক্য ১৮ কোটি মানুষের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে নেমেছে, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণ, তেল, গ্যাস বিদ্যুতের দাম নিয়ন্ত্রণ করে কমিয়ে আনা, জনভোগান্তির নিরসন, দ্রুব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, খুনিদের বিচার নিশ্চিত, সম্পদ লুণ্ঠণকারীদের বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে আমাদের আন্দোলন চলমান।
জনদুর্ভোগ লাঘব, তেল, গ্যাসসহ নিত্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রাজধানীর মুক্তাঙ্গণে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে এক অবস্থান কর্মসূচিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের ১১ দফা জনগণের হাতে তুলে দেয়ার জন্য আমরা আজ এখানে এসেছি। এ ১১ দফা কোনো দলের নয়, কোনো ব্যক্তির নয়, কোনো গোষ্ঠীর নয়; বরং ১৮ কোটি মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য। আমরা অধিকারের পক্ষে লড়াই করতে নেমেছি। আমরা জনগণের দাবি আদায় করে ছাড়ব। আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরো বলেন, যারা বিরোধীমতের প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ করার জন্য গুলি চালিয়েছে, খুন করেছে, গুম করেছে, জুলুম-নির্যাতন করেছে, ঘরছাড়া করেছে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে, জীবিত থাকতে আমরা তাদের আর এ দেশে আস্ফালন করার সুযোগ দেবো না।
পরে তিনি ১১ দলের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে সরকারকে সতর্ক করে বলেন, ইতোমধ্যে ১১ দল অনেকগুলো কর্মসূচি পালন করেছে। নতুন ঘোষিত লংমার্চ জনগণের দাবি আদায়ের জন্য। অতীতের মতো যেন বাধা দেয়া না হয়। বাধা দিলে, লংমার্চ দ্বিগুণ গতিতে গন্তব্যে পৌঁছবে।
নতুন কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম লংমার্চ; ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর লংমার্চ; ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা লংমার্চ; ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেট লংমার্চ (রেলপথে) এবং ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ।
কর্মসূচি ঘোষাণা করে জামায়াত আমির সচিবালয়ের দিকে রওনা হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সচিবালয়ে যারা বসে আছেন- মন্ত্রী, এমপি, সচিব তাদের জনগণের কথা শুনতে হবে, মানতে হবে। সচিবালয় কোনো দলের নয়। সংসদে যেন আর মিথ্যা বিবৃতি না দেয়া হয়।
তিনি বলেন, চুলায় গ্যাস চাই, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ চাই, বিশুদ্ধ খাবার পানি চাই, গাড়ির জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস চাই। এলপিজির বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার করুন। আর গ্যাসের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করবেন না।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সঙ্কট তৈরির পরবর্তী পদক্ষেপ হলো দাম বাড়ানো। আমরা তা হতে দেবো না। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দফতর ঘেরাও করতে বাধ্য হবো।
এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এমপি বলেন, বৃষ্টির মধ্যে বসে আমরা সমাবেশ করছি। এটি সরকারের জন্য একটি বার্তা। সরকার ৫ মাসে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। গ্যাস দিতে পারছে না, বিদ্যুৎ দিতে পারছে না।
তিনি বলেন, ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রদল বিরোধীদলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তির ওপর হামলা চালাচ্ছে। ছাত্রলীগের মতো তারা হামলা করছে। ক্যাম্পাসগুলো কোনো অবস্থাতেই তাদের হাতে ছেড়ে দেয়া হবে না।
নাহিদ আরো বলেন, সরকার নাগরিকদের অত্যাচার করছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সরকার প্রতি পদে পদে বিশ্বাসঘাতকতা করে যাচ্ছে। সরকার যদি গ্যাস বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ না করে, তাহলে সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। বাংলাদেশের জনগণ তাদেরকে আর কোনো সুযোগ দেবে না। সরকার গ্যাসের দাম দফায় দফায় বাড়িয়েছে। আবার বাড়ানোর পাঁয়তারা করলে গদিতে বসে থাকতে পারবে না।
তিনি বলেন, সরকার যদি গ্যাস, বিদ্যুৎ ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে এই সরকার যেন ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন না দেখে।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, বিএনপির ২০ লক্ষাধিক লোক চাঁদাবাজিতে নেমেছে। তিন মাসে ৩১ হাজার কোটি টাকা ঋণ খেলাপি হয়েছে। সরকার চালাতে শিক্ষিত, জ্ঞানী, দক্ষ লোকের প্রয়োজন। ব্যাংক খেলাপি দুর্নীতিবাজদের দিয়ে দেশ চালানো যাবে না। জনগণের দাবি আদায়ের জন্য আমাদের যা যা প্রয়োজন, তা করব।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ক্যাম্পাসগুলোতে বিশৃঙ্খলা করা হচ্ছে। জুলাইযোদ্ধাদের পরিবারগুলোর চোখে পানি এসেছে। বিরোধীদলের পক্ষ থেকে দাবি করছি- ছাত্রদলকে সংযত করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করুন।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন বলেন, দেশে যদি তেল, গ্যাস, জ্বালানির সঙ্কট থাকে, গ্যাস না থাকে এবং দ্রব্যমূল্য বাড়তে থাকে, তাহলে সরকারের দায়িত্ব কী? যদি জনগণের দুঃখ না বুঝে সরকার, তাহলে তাদের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নাই। আমরা জনগণের সাথে আছি। অবিলম্বে জ্বালানি ও তেলের দাম কমাতে হবে। নইলে গদি ছেড়ে দিতে হবে।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা: মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, আমরা বিদ্যুৎ চাই, আমরা বিশুদ্ধ পানি চাই। বিদ্যুৎ গ্যাসের অভাবে শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। টাকা ছাপিয়ে ব্যাংকে দেয়া হচ্ছে। এভাবে একটি দেশ চলতে পারে না। আপনারা ব্যর্থ হয়ে গেছেন, দেশ চালাতে পারবেন না। বিএনপি জুলাইয়ে বিশ্বাস করে না, সংস্কার চায় না। রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য এ দেশের মানুষ বিপ্লব করেছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, সরকারের পায়ের নিচে মাটি নেই। সরকার বেসামাল হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী জানেন না, তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। হামলা, মামলা, দলীয়করণ ও দখলদারিত্ব বন্ধ করতে হবে। নতুবা ক্ষমতায় থাকা যাবে না।
এবি পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, একসময় আমরা গ্যাসে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিলাম, যা আজ শূন্যের কোঠায় নিয়ে গেছে। আমাদের গ্যাস ব্লকগুলো থেকে ভারত ও মিয়ানমার পাইপের মাধ্যমে গ্যাস নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হুমকির মধ্যে ফেলে দেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, মিয়ানমার থেকে এলএনজি আমদানির কথা বলা হচ্ছে। দেশকে নিরাপত্তা ও জ্বালানি ঝুঁকিতে ফেলে দেয়া হচ্ছে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েবে আমির মুফতি মুখলেসুর রহমান কাসেমী বলেন, সরকার এখন জনগণকে বাদ দিয়ে ‘ক্ষমতা’ ক্ষমতা’ করছেন। অতীতের সরকার এমন কথার কারণে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে।
প্রধান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে জাগপার সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ বলেন, দ্রব্যমূল্যের কী অবস্থা সেটা দোকানিকে নিজে জিজ্ঞেস করবেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্দ্ধগতিতে, বিদ্যুৎ ও তেল-গ্যাসের অভাবে দেশের মানুষ আজ দিশেহারা। তাই আপনার আর এক মুহূর্তও ক্ষমতায় থাকার অধিকার নাই।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ফখরুল ইসলাম বলেন, দেশটা দ্বিতীয়বার স্বাধীন হয়েছে। শুধু তারেক রহমান ও তার দল বিএনপি সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে। কিন্তু বিরোধী দলের নেতাদের বাকস্বাধীনতা পর্যন্ত তারা দিতে চান না। দেশের জনগণ প্রয়োজনে দেশের স্বাধীনতার জন্য আরেকবার একাকার হয়ে আরেকটা বিপ্লব ঘটাবে ইনশাল্লাহ।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট একেএম আনোয়ারুল ইসলাম চান বলেন, আমরা আজকে এমন একটি রাজনৈতিক প্রতারক দলের বিরুদ্ধে অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে এসেছি, যারা মুখে এক কথা বলেন; বাস্তবে তার বিপরীত কাজ করেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ডা. ফখরুদ্দিনের সঞ্চালনায় আরো বক্তব্য দেন ডিপিডিসি শ্রমিক কল্যাণ পরিষদের সভাপতি আ ন ম বজলুর রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য আছিয়া খাতুন, ভুক্তভোগী গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মালিক জুয়েল শুক্কুর, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি কামাল হোসেন এমপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সভাপতি মাওলানা আনোয়ার হোসাইন রাজী, সিএনজি চালক মিজানুর রহমান, এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট ড. আওরঙ্গজেব বেলাল, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসাইন মিয়াজী, শ্রমিককল্যাণ কনট্রাকশনের কর্মকর্তা ইউসুফ আলী আকন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইকবাল হোসাইন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মুখপাত্র জনাব মো: নাজমুল ইসলাম তালুকদার প্রমুখ।
এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, সাবেক সংসদ সদস্য, ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন প্রমুখ।



