জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের বাজেটের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে গণঅধিকার পরিষদ।
শনিবার (১৩ জুন) বিকেল ৪টায় গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ। এসময় সামগ্রিক বিষয়ে বক্তব্য রাখেন দলের মুখপাত্র ফারুক হাসান।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন গণঅধিকার পরিষদে উচ্চতর পরিষদের সদস্য শহিদুল ইসলাম ফাহিম, মাহফুজুর রহমান খান, দফতর সম্পাদক মাহবুবর রহমান, সহ-স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক রবিউল ইসলাম, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শাহজাহান, আশরাফুল আলম, শ্রমিক অধিকার পরিষদের সভাপতি আব্দুর রহমান, পেশাজীবী অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান সুমন প্রমুখ।
তাদের লিখিত বাজেট প্রতিক্রিয়াটি নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো :
জাতীয় বাজেট ২০২৬–২৭ : জনগণের প্রত্যাশা, সম্ভাবনা ও করণীয়
সুধী সাংবাদিকবৃন্দ,
বর্তমান সরকারের ঘোষিত ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের ওপর গণঅধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে আমাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরছি। আমরা বিশ্বাস করি, বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতিফলন।
১. বাজেটের উপর সামারি বক্তব্য:
২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটের মোট আকার ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকা। সরকারের লক্ষ্য ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা।
বর্তমানে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো:-
১। উচ্চ মূল্যস্ফীতি
২। যুব বেকারত্ব
৩। বিনিয়োগে স্থবিরতা
৪। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা
৫। রাজস্ব আহরণে সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বয়স ১৫-৩৫ বছরের মধ্যে। তাই এই বাজেটকে আমরা তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টিকোণ থেকেও মূল্যায়ন করছি।
গণঅধিকার পরিষদ মনে করে, বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে সাধারণ মানুষের বাজার খরচ কমেছে কি না, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে কি না এবং তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে কি না তার ওপর।
২. *বাজেটের ইতিবাচক দিক:-
ক) মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
গত কয়েক বছরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ইতিবাচক।
খ) উন্নয়ন ব্যয়ে বড় বরাদ্দ
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রায় ৩.১৬ লাখ কোটি টাকা।
এতে গুরুত্ব পেয়েছে:-
১। যোগাযোগ অবকাঠামো
২। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
৩। শিক্ষা
৪। স্বাস্থ্য
৫। স্থানীয় সরকার
সঠিক বাস্তবায়ন হলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
গ) বিনিয়োগ ও শিল্পায়নে গুরুত্ব:-
দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ বেসরকারি খাত নির্ভর। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি কর্মসংস্থানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঘ) সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি অব্যাহত:
নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী, বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখা হয়েছে।
৩. *বাজেটের নেতিবাচক দিক:-
ক) যুব কর্মসংস্থান বিষয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনার ঘাটতি:
প্রতি বছর প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে।
কিন্তু বাজেটে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা, যুব কর্মসংস্থান তহবিল কিংবা জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি সম্পর্কে সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই।
এটি একটি বড় দুর্বলতা।
খ) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অত্যন্ত উচ্চ:
সরকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকা।
বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জনে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
যদি রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী না হয়, তাহলে উন্নয়ন প্রকল্প এবং সামাজিক ব্যয় সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
গ) ঋণনির্ভর অর্থায়ন
বাজেট ঘাটতি প্রায় ২.৪৩ লাখ কোটি টাকা।
অর্থাৎ বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ব্যয় ঋণের মাধ্যমে মেটানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
একইসাথে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধেই প্রায় ১.২৭ লাখ কোটি টাকা ব্যয় হবে, যা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সম্মিলিত বরাদ্দের কাছাকাছি।
ঘ) দুর্নীতি ও অপচয় রোধে দৃশ্যমান কাঠামোর অভাব
বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্পে সময় বৃদ্ধি ও ব্যয় বৃদ্ধি একটি বড় সমস্যা।
প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে জনগণ বাজেটের পূর্ণ সুফল পাবে না।
ঙ) মধ্যবিত্ত ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা নেই
বর্তমান অর্থনৈতিক চাপে সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে
১। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার
২। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী
৩। নতুন উদ্যোক্তা
৪। ফ্রিল্যান্সার ও স্টার্টআপ খাত
এই খাতগুলোর জন্য আরও বড় প্রণোদনা প্রয়োজন ছিল।
৪. *গণঅধিকার পরিষদের পরামর্শ
১. "জাতীয় যুব কর্মসংস্থান মিশন" চালু করতে হবে
আগামী তিন বছরে অন্তত ২০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
২. স্টার্টআপ ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ তহবিল। ১,০০০ কোটি টাকার একটি জাতীয় যুব উদ্যোক্তা তহবিল গঠনের প্রস্তাব করছি।
৩. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ শুধু বাজেটে ঘোষণা দিয়ে সম্ভব নয়।বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা।
খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারে সিন্ডিকেট ও কারসাজির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
৪. শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ।
বর্তমান বিশ্বে দক্ষতাই সবচেয়ে বড় সম্পদ।
১। আইটি
২। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)
৩। কারিগরি শিক্ষা
৪। গবেষণা ও উদ্ভাবন
তাই উপরোক্ত খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে।
৫. *দুর্নীতিমুক্ত উন্নয়ন বাস্তবায়ন:-
প্রতিটি বড় উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়, অগ্রগতি এবং ফলাফল জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।
৬. স্থানীয় সরকার ও নাগরিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি।
বাজেট বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণ ও তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
গণঅধিকার পরিষদ বিশ্বাস করে, এই বাজেটের মধ্যে সম্ভাবনা আছে, তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে জনগণকেন্দ্রিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। একই সঙ্গে আমরা মনে করি, বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে যুবসমাজ, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন।



