আর্থিক দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সাভার উপজেলা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে

যোগদানপত্র গ্রহণে জটিলতা থেকে বদলি বিতর্ক

সাভার উপজেলা প্রকৌশলী নিজের দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্নীতি আড়াল করতে তাকে পরিকল্পিতভাবে হয়রানি করেছেন, যোগদানপত্র গ্রহণে অযৌক্তিক বিলম্ব করেছেন এবং পরে প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে অন্যত্র বদলির ব্যবস্থা করেছেন।

ইকবাল মজুমদার তৌহিদ
সাভারের উপজেলা প্রকৌশলী মো: মিনারুল ইসলাম
সাভারের উপজেলা প্রকৌশলী মো: মিনারুল ইসলাম |সংগৃহীত

ঢাকার সাভার উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) কার্যালয়কে ঘিরে আর্থিক দুর্নীতি, প্রশাসনিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, বদলি বাণিজ্য, যোগদানপত্র গ্রহণে বাধা এবং সরকারি আদেশ অমান্যের অভিযোগ সামনে এসেছে।

এসব অভিযোগ তুলে উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো: রেজওয়ানুর রহমান প্রধান প্রকৌশলীর কাছে একাধিক লিখিত আবেদন করেছেন।

আবেদনে তিনি দাবি করেছেন, সাভার উপজেলা প্রকৌশলী নিজের দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্নীতি আড়াল করতে তাকে পরিকল্পিতভাবে হয়রানি করেছেন, যোগদানপত্র গ্রহণে অযৌক্তিক বিলম্ব করেছেন এবং পরে প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে অন্যত্র বদলির ব্যবস্থা করেছেন।

অন্যদিকে, এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী সাভারের উপজেলা প্রকৌশলী মো: মিনারুল ইসলামের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগে কৈফিয়ত তলব করেছেন। একইসাথে বদলিকৃত দুই কর্মকর্তার যোগদানপত্র গ্রহণ ও দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়ার নির্দেশও দেয়া হয়েছে। ফলে সাভার এলজিইডির প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

মো: রেজওয়ানুর রহমান জানান, প্রধান কার্যালয়ের বদলি আদেশ অনুযায়ী ২০২৬ সালের ২৭ জুলাই তিনি গাজীপুর সদর উপজেলা থেকে সাভার উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ে উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে যোগদানপত্র দাখিল করেন। তবে বিধি অনুযায়ী যোগদান করলেও উপজেলা প্রকৌশলী তা গ্রহণ করেননি এবং কোনো লিখিত কারণও জানাননি।

রেজওয়ানুর রহমানের অভিযোগ, যোগদানপত্র জমা দেয়ার পরও তাকে চাকরিতে যোগদান, দায়িত্ব গ্রহণ, বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ও আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। সাত কার্যদিবস অতিবাহিত হওয়ার পরও কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় তিনি বিষয়টি উপজেলা প্রকৌশলীকে অবহিত করেন। এ সময় উপজেলা প্রকৌশলী তার উপস্থিতিতেই মন্তব্য করেন, ‘তিনি কারো চাকরি করেন না, নিজের চাকরি নিজেই করেন।’

তিনি আরো অভিযোগ করে বলেন, এ বিষয়ে পরে তিনি লিখিত আবেদন জমা দিতে গেলে উপজেলা প্রকৌশলী কিংবা তার কার্যালয় সেটি গ্রহণ করেনি। বাধ্য হয়ে অফিস শেষ হওয়ার আগেই তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে আবেদন দাখিল করেন।

প্রধান প্রকৌশলীর কৈফিয়ত তলব

ঘটনার পর এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো: বেলাল হোসেন সাভারের উপজেলা প্রকৌশলী মো: মিনারুল ইসলামের কাছে কৈফিয়ত চান।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, প্রধান কার্যালয়ের বদলি আদেশ এবং গাজীপুর সদর উপজেলা কার্যালয়ের ছাড়পত্রের ভিত্তিতে মো: রেজওয়ানুর রহমান ২৭ জুলাই যোগদানপত্র জমা দিলেও ১২ দিনেরও বেশি সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও তা গ্রহণ করা হয়নি।

একই চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়, হিসাবরক্ষক (চলতি দায়িত্ব) শাহনাজ পারভীনকে বদলি করে সাভারে পাঠানো হলেও তাকেও দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। পরিবর্তে সাবেক হিসাবরক্ষক কাজী আসাদুল হায়দারকে দিয়েই হিসাবসংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছিল।

অথচ এই কাজী আসাদুল হায়দারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও জাল সনদে চাকরি নেয়াসহ অভিযোগের শেষ নেই।

প্রধান প্রকৌশলী তার আদেশে বলেন, এই আচরণ কর্তৃপক্ষের বৈধ নির্দেশ অমান্য করার শামিল এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী অসদাচরণের পর্যায়ে পড়ে।

তিনি সাত কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে এবং বদলিকৃত কর্মকর্তাদের যোগদান গ্রহণ ও দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন।

পরে প্রধান প্রকৌশলীর কাছে দেয়া আরেক আবেদনে মো: রেজওয়ানুর রহমান দাবি করেন, যোগদান গ্রহণে বাধা দিয়েও যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি, তখন উপজেলা প্রকৌশলী প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে তাকে অন্যত্র বদলির ব্যবস্থা করেন।

তার ভাষ্য, এই বদলির উদ্দেশ্য ছিল উপজেলা প্রকৌশলীর দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়ম আড়াল করা।

তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী হিসাবরক্ষকের মাধ্যমে সংঘটিত আর্থিক অনিয়ম এবং নতুন করে সংঘটিত দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তার দাবি, এসব তথ্য সামনে এলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারত।

আবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, গত ১০ আগস্ট উপজেলা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারির দিন তাকে উপজেলা প্রকৌশলীর কক্ষে ডেকে নেয়া হয়। সেখানে বহিরাগত ব্যক্তিদের মাধ্যমে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন রেজওয়ানুর রহমান।

তার দাবি, ওই ঘটনার পর থেকে অপরিচিত ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা নিয়মিত তাকে অনুসরণ করছে, যা তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।

এ কারণে তিনি গত ১৬ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও তিনি কোনো প্রশাসনিক সহায়তা পাননি।

রেজওয়ানুর রহমান তার আবেদনে আরো দাবি করেন, উপজেলা প্রকৌশলী যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিজের স্বার্থের পরিপন্থী মনে করেন, তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করা হয়।

তার অভিযোগ, কখনো সাভারের সংসদ সদস্যের নাম, আবার কখনো কেরানীগঞ্জের সংসদ সদস্যের নাম ব্যবহার করে সদর দফতরে নেতিবাচক বার্তা পাঠানো হয় যে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা স্থানীয় সংসদ সদস্যের অপছন্দের ব্যক্তি। এর মাধ্যমে বদলি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।

রেজওয়ানুর রহমান তার অভিযোগে কয়েকটি প্রশাসনিক অনিয়মও তুলে ধরেন।

তার দাবি, যোগদানপত্র গ্রহণে অযৌক্তিক বিলম্ব করা হয়েছে, অশোভন আচরণ করা হয়েছে এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে।

এছাড়া তিনি দাবি করেন, অফিসের পত্রজারি রেজিস্টারের প্রায় ৪০ শতাংশ ক্রমিক নম্বর ফাঁকা রয়েছে, যা প্রশাসনিক অনিয়মের ইঙ্গিত বহন করতে পারে এবং বিষয়টি তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।