দুর্নীতি, অনিয়ম, অপচয় ও ক্ষমতার অপব্যবহারের পর ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে এসব অনিয়ম প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত ও প্রতিরোধে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে স্থায়ী পরিবীক্ষণ সেল গঠনের দাবি জানিয়েছেন যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো: মোক্তার আলী। জামায়াতে ইসলামীর এই সদস্য বলেছেন, নিয়মিত পরিবীক্ষণ, কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন ও ঝুঁকি নিরূপণের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় রোধ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে কার্যপ্রণালী-বিধির ৭১ বিধিতে দেয়া মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশে তিনি এ দাবি জানান।
নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সরকারি কার্যক্রম আরো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে তিন সদস্যের পরিবীক্ষণ টিম গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এসব টিম দৈবচয়নের ভিত্তিতে বিভিন্ন দফতর পরিদর্শন করে প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করবে এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেবে।
মো: মোক্তার আলী নোটিশে বলেন, দুর্নীতি, অনিয়ম, অপচয়, দায়িত্বে অবহেলা ও ক্ষমতার অপব্যবহার রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান অন্তরায়। তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়ন, সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে কার্যকর পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
নোটিশে তিনি বলেন, বিভিন্ন পর্যায়ে তদারকি ব্যবস্থা থাকলেও নিয়মিত পরিবীক্ষণ, কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন, ঝুঁকি নিরূপণ এবং অনিয়মের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য একটি নিবেদিত পরিবীক্ষণ সেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এর মাধ্যমে দুর্নীতি, অনিয়ম, অপচয় ও ক্ষমতার অপব্যবহার প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
তার মতে, পরিবীক্ষণ সেল থাকলে সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং অপচয় কমবে। একইসাথে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহিতা, কর্মদক্ষতা ও দায়িত্বশীলতা বাড়বে। এতে জনসেবার মান ও স্বচ্ছতাও বৃদ্ধি পাবে।
এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম চিহ্নিত করে সময়োপযোগী সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেয়া সহজ হবে এবং অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ অন্যান্য তদারকি সংস্থার সাথে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করেন তিনি।
সরকারের বহুমাত্রিক নজরদারি
নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন হিসেবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি ঘোষণা করেছে। এর ভিত্তিতে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, ইনসাফভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক শাসন ও সুশাসন সুদৃঢ় করতে সরকার অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে মহানগর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ইতোমধ্যে ৫০৪টি দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি সংঘটিত হওয়ার আগে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এবং অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত অভিযান পরিচালনার জন্য এনফোর্সমেন্ট ইউনিট কার্যকর রয়েছে।
অভিযোগ গ্রহণে ১০৬ হটলাইনের পাশাপাশি ৯৯৯ ও ৩৩৩-এর মতো জাতীয় হটলাইনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে জানান তিনি।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম বা অসদাচরণের তথ্য পাওয়া গেলে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হয় বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন আইন, ২০০৪, দণ্ডবিধি ও ফৌজদারি কার্যবিধিসহ প্রযোজ্য আইনে ব্যবস্থা নেয়া হয়।
উন্নয়ন প্রকল্পেও নজরদারি
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের বহুমাত্রিক তদারকি ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি), প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি (পিএসসি), সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বাস্তবায়ন সেল ও উন্নয়ন শাখা এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকল্প বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
এ ছাড়া পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন ও পরিবীক্ষণ এবং এডিপি মনিটরিং সিস্টেমের মতো ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ এবং অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (জিআরএস) চালু রয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সরকারি সেবার মান উন্নয়ন, প্রকল্প ও কর্মসূচি সময়মতো বাস্তবায়ন, সরকারি সম্পদের কার্যকর ব্যবহার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বাড়াতে গভর্নমেন্ট পারফরম্যান্স মনিটরিং সিস্টেম (জিপিএমএস) প্রবর্তন করা হয়েছে।
তিন সদস্যের পরিবীক্ষণ টিম
সরকারি কার্যক্রমের বাস্তব চিত্র আরো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে তিন সদস্যের পরিবীক্ষণ টিম গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এসব টিম দৈবচয়নের ভিত্তিতে বিভিন্ন দফতর পরিদর্শন করে কার্যক্রমের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করবে। উত্তম চর্চা চিহ্নিত ও সম্প্রসারণের সুপারিশ করবে এবং জনগণের সেবা প্রদানের গতি বাড়ানোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে দাখিল করবে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক গঠিত পরিবীক্ষণ টিম ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে বলেও জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ নয়; বরং এমন একটি প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে দুর্নীতির সুযোগ ক্রমাগত সংকুচিত হবে। সরকারি কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং জনগণকে দ্রুত ও হয়রানিমুক্তভাবে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেয়াই সরকারের লক্ষ্য।
‘আইনের শাসন বাস্তবায়নে সবাইকে পাহারাদার হতে হবে’
নোটিশের জবাবের পর সম্পূরক প্রশ্নে মো. মোক্তার আলী বলেন, বিভিন্ন সরকার আমলে অনেক ভালো উদ্যোগ নেয়া হলেও সেগুলোর কার্যকারিতা সব সময় প্রত্যাশিত পর্যায়ে ছিল না।
তিনি বলেন, ‘এগুলোকে সঠিকভাবে কার্যকর করতে হলে আমার দৃষ্টিতে রুল অব ল প্রয়োজন, স্ট্রিক্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন প্রয়োজন, সাথে সাথে ইন্ডিপেন্ডেন্ট জুডিশিয়ারি সিস্টেম প্রয়োজন।’
পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন ও মনিটরিং কার্যকরভাবে করা হলে দেশে সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। সরকারের দেওয়া জবাবে আস্থা প্রকাশ করে মোক্তার আলী বলেন, উদ্যোগগুলো এখন প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হবে বলে তিনি আশাবাদী।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা যথেষ্ট স্বাধীন উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আরো কিছু পদক্ষেপ প্রয়োজন এবং এ জন্য যেসব আইন আনার কথা রয়েছে, সেগুলো আনা হবে।
আইনের শাসন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আইনের শাসন বাস্তবায়নের জন্যই বর্তমান সরকার কাজ করছে। আইনের শাসন বাস্তবায়নের জন্য সকল জনগণকে পাহারাদার হিসেবে কাজ করতে হবে। ব্যুরোক্রেসিকে মনিটরিং করতে হবে।’
উন্নয়ন প্রকল্প সঠিকভাবে ও নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়নের জন্য মূল্যায়ন ও মনিটরিং টিম এবং মন্ত্রণালয়ভিত্তিক অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে টিম গঠন করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, এসব টিম যেকোনো দফতর যেকোনো সময় দৈবচয়নের ভিত্তিতে পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেবে। এর মাধ্যমে জবাবদিহিতা, মনিটরিং, বাস্তবায়ন ও আইনের শাসন কার্যকর করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।



