৫ মাস পর সংসদে মির্জা আব্বাস

ফিরে এসেছি মানুষের কাছে, বাংলাদেশের জন্য কাজ করতে

বাংলাদেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনাদের সবাইকে আন্তরিকভাবে, আপনাদের মাধ্যমে সকল সংসদ সদস্য এবং বাংলাদেশের জনগণকে আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে চাই। তারা আমার জন্য যথেষ্ট দোয়া করেছেন, বিভিন্ন প্রোগ্রামের মাধ্যমে আমার সুস্থতা কামনা করেছেন। দোয়া ও নির্দেশে আমি সবার কাছে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’

সংসদ প্রতিবেদক
৫ মাস পর সংসদে মির্জা আব্বাস
৫ মাস পর সংসদে মির্জা আব্বাস |সংগৃহীত

দীর্ঘ প্রায় পাঁচ মাস পর জাতীয় সংসদে ফিরলেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস।

বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রথমবারের মতো যোগ দিয়ে আবেগঘন বক্তব্য দেন তিনি। তার বক্তব্যের সময় সংসদে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন উপস্থিত সংসদ সদস্যরাও।

হুইলচেয়ারে বসে দেয়া বক্তব্যে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আমি ফিরে এসেছি মানুষের কাছে। মানুষের জন্য এবং বাংলাদেশের জন্য কাজ করার জন্য।’

বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে সংসদ অধিবেশনকক্ষে প্রবেশ করেন মির্জা আব্বাস। পরে বিকেল ৫টা ৪৬ মিনিটে সংসদে বক্তব্য শুরু করেন তিনি। প্রায় ৬ মিনিট বক্তব্য রাখেন তিনি।

দীর্ঘ প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস ধরে চিকিৎসাধীন থাকার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, তার চিকিৎসা এখনো শেষ হয়নি। চিকিৎসার মাঝপথেই আবেগ ও ভালোবাসার কারণে সংসদে এসেছেন তিনি।

সংসদে বক্তব্য দেয়ার সময় হুইলচেয়ারে ছিলেন মির্জা আব্বাস। তিনি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো: আমানউল্লাহ আমানের আসনের মাইক্রোফোন ব্যবহার করে বক্তব্য দেন। লিখিত বক্তব্য পড়তে তাকে সহায়তা করেন আমানউল্লাহ আমান।

বক্তব্যের শুরুতেই সংসদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মীদের ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানান মির্জা আব্বাস। তিনি বলেন, ‘আপনার মাধ্যমে সংসদের আমার সকল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী ভাইদেরকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।’

নিজের অসুস্থতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আপনারা হয়তো জানেন যে, আমি প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস চিকিৎসাধীন আছি। আমার নির্বাচনের পরপর এক মিটিংয়ে আমি গুরুতরভাবে রোগাক্রান্ত হই এবং তারপর থেকে আমি বিদেশে চিকিৎসাধীন ছিলাম। ভুল হবে—এখনো আছি। আবেগ, ভালোবাসা—এই কারণে আমাকে আসতে হয়েছে। আমার চিকিৎসা এখনো শেষ হয়নি।’

রাজনৈতিক জীবনে বৃহস্পতিবারের দিনটিকে অত্যন্ত আবেগঘন ও স্মরণীয় হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আমি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও গভীর কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি মহান স্বাধীনতার ঘোষক, গণতন্ত্রের প্রবক্তা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্রের নেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে।’

তিনি বলেন, ‘আজকে আমার রাজনৈতিক জীবনের অত্যন্ত আবেগঘন এবং স্মরণীয় একটি দিন। ২০০৬ সালের পর আজ আমি মহান জাতীয় সংসদের এই পবিত্র পক্ষ থেকে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি একজন সদস্য হিসেবে। এর চেয়ে গর্বের মুহূর্ত আর কী হতে পারে?’

স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে বিদেশে চিকিৎসা
সংসদে না আসতে পারার কারণ ব্যাখ্যা করে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘বর্তমান সংসদ যাত্রা শুরু করার পরপরই বিগত ১১ মার্চ ২০২৬ তারিখে স্ট্রোক আক্রান্ত হয়ে আমি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ি। দীর্ঘ সময় চিকিৎসার জন্য আমাকে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ায় থাকতে হয়েছে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে ইচ্ছা সত্ত্বেও সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত হতে পারিনি।’

তিনি বলেন, ‘আজ চিকিৎসা শেষে—ভুল হবে, আমার চিকিৎসা শেষ হয়নি, চিকিৎসার মাঝপথে—প্রথমবারের মতো আমি সংসদীয় অধিবেশনে উপস্থিত হয়ে মহান আল্লাহতায়ালার কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।’

এই কঠিন সময়ে যারা তার জন্য দোয়া করেছেন, খোঁজখবর নিয়েছেন ও পাশে থেকেছেন, তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান বিএনপির এই নেতা।

রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর খোঁজখবর
অসুস্থতার সময় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেয়ার কথাও সংসদে তুলে ধরেন মির্জা আব্বাস। তিনি বলেন, ‘আমার অসুস্থ সময়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সার্বক্ষণিক আমার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিয়েছেন। এজন্য মাননীয় রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাদেরকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।’

স্পিকারের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনি নিজেও আমাকে দেখে এসেছেন। যদিও আমি আপনাকে দেখতে পারিনি, আমি পরে জেনেছি। একজন সংসদ সদস্যের প্রতি সংসদের স্পিকারের এই মানবিক, আন্তরিক আচরণ আমাকে স্পর্শ করেছে।’

স্পিকারের এই আচরণকে সংসদীয় গণতন্ত্রের মানবিক ও সুন্দর দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আপনাদের ভালোবাসা ও আন্তরিক কথা আমি কোনোদিন ভুলব না। মহান জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে আপনার দায়িত্বের পাশাপাশি একজন মানুষ হিসেবে যে মহত্ত্ববোধ আপনি দেখিয়েছেন, তার জন্য আমি আপনার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’

রাজনীতি মানুষের জন্য
সংসদে ফিরে রাজনীতির মূল লক্ষ্য মানুষের কল্যাণ হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন মির্জা আব্বাস। তিনি বলেন, ‘আজ মহান সংসদে ফিরে এসে আমার মনে হচ্ছে, জাতীয় রাজনীতি শুধু মতের পার্থক্য নয়। রাজনীতি মানুষের জন্য।’

নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষ এবং দেশের জন্য কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, মহান আল্লাহ যেন আমাকে সুস্থতা ও সততার সাথে বাকি সময় দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেন। যাতে আমার নির্বাচনী এলাকার মানুষের জন্য, বাংলাদেশের জন্য যত সময় বাকি, আরো নিষ্ঠা সহকারে দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে কাজ করতে পারি।

সহকর্মী সংসদ সদস্যদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আপনাদের ভালোবাসা ও শুভকামনা, দোয়া আমাকে এই কঠিন সময় অতিক্রম করতে সাহায্য করেছে।’

আমি ফিরে এসেছি মানুষের কাছে
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আবেগঘন কণ্ঠে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘২০০৬ সালের পর আজ আমার এই মহান সংসদে দাঁড়িয়ে আমি শুধু এই কথা বলতে চাই—আমি ফিরে এসেছি মানুষের কাছে। মানুষের জন্য এবং বাংলাদেশের জন্য কাজ করার জন্য।’ তিনি মহান আল্লাহর কাছে দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করেন।

বাংলাদেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনাদের সবাইকে আন্তরিকভাবে, আপনাদের মাধ্যমে সকল সংসদ সদস্য এবং বাংলাদেশের জনগণকে আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে চাই। তারা আমার জন্য যথেষ্ট দোয়া করেছেন, বিভিন্ন প্রোগ্রামের মাধ্যমে আমার সুস্থতা কামনা করেছেন। দোয়া ও নির্দেশে আমি সবার কাছে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’

সবশেষে তিনি বলেন, ‘আপনারা দোয়া করবেন, আমি যাতে বাকি সময়টুকু দেশ এবং জাতির জন্য, দেশের জন্য যেন কিছু করতে পারি।’ এরপর সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে আসসালামু আলাইকুম বলেন মির্জা আব্বাস। তার বক্তব্য শেষে টেবিল চাপড়িয়ে তাকে সমর্থন জানান সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা।