অর্থ পাচারে জড়িত ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার ভিত্তিকে চিহ্নিত করেছে সরকার। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর আওতায় এসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। অভিযুক্তরা হলেন- সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার, নাবিল গ্রুপ, এইচবিএম ইকবাল এবং সামিট গ্রুপ।
রোববার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সংরক্ষিত নারী আসনের (মহিলা আসন-৩৯) সংসদ সদস্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের নেত্রী অ্যাডভোকেট সাবিকুন্নাহারের টেবিলে উত্থাপিত তারকা চিহ্নিত এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ কথা জানান।
সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহার (৩৩৯ মহিলা আসন-৩৯) অর্থমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্য অনুযায়ী ২০০৯-২০২৩ সময়কালে বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা) বিদেশে পাচার হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকার এ পর্যন্ত মোট কত অর্থ ও সম্পদের সন্ধান পেয়েছে। পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে কিনা; করলে, তার বাস্তব অগ্রগতি কতদূর?
জবাবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্রে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে বিভিন্ন জটিল পদ্ধতি অবলম্বন করে বিদেশে পাচার করা হয়ে থাকে এবং এ বিষয়ে দেশে বা বিদেশে সঠিক, পর্যাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য তথ্য বা প্রতিবেদনের অভাবে বাংলাদেশ থেকে কী পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে তার প্রকৃত ও সঠিক পরিমাণ নিরূপণ করা অত্যন্ত কঠিন। এ ছাড়া, সংশ্লিষ্ট দুটি দেশের ব্যক্তি বা সত্তার মধ্যে সম্পাদিত ইনফরমাল লেনদেনের তথ্য প্রাপ্তির কোনো ব্যবস্থা না থাকার কারণে একদেশ থেকে অন্য দেশে ইনফরমাল চ্যানেলে পাচার হওয়া অর্থের সঠিক পরিমাণ নিরূপণ করা যায় না। তবে এটা সত্য বিগত সরকারের আমলে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক এখন পর্যন্ত দেশে-বিদেশে প্রায় ৭৬ হাজার ৮১৪ কোটি টাকার সম্পদ শনাক্ত করা হয়েছে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়েছে। এ অর্থ পুনরুদ্ধারে সরকার নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে:
(ক) বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধকল্পে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে ১২ সদস্য বিশিষ্ট একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। টাস্কফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর আওতায় ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কেস চিহ্নিত করা হয়। কেইস গুলো হলো- সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার, নাবিল গ্রুপ, এইচবিএম ইকবাল এবং সামিট গ্রুপ।
(খ) ওই মামলাগুলো অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে এবং বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল (Joint Investigation Team- JIT) গঠন করা হয়। JIT গঠনের পর ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কেইসের ক্ষেত্রে বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে দেশে-বিদেশে সর্বমোট প্রায় ৭৬ হাজার ৯ শ’ ৮৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ সংযুক্ত (Attachment) ও অবরুদ্ধ (Freeying) করা হয়েছে; (গ) দেশের আদালত কর্তৃক প্রদত্ত আদেশ বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশে ২৩টি Mutual Legal Assistance Request (MLAR) প্রেরণ করা হয়েছে। পাচার অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১৪২টি মামলা রুজু করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৬টি মামলার চার্জশীট দাখিল করা হয়েছে এবং ৬টি মামলার রায় প্রদান করা হয়েছে।
(ঘ) অর্থ পাচারের গন্তব্য দেশগুলোর মধ্যে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত ১০টি (Canada, USA, UK, UAE, Singapore, Malaysia, Australia, Swityerland, Thailand and Hongkong- China) দেশের সাথে পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি (MLAT) স্বাক্ষরের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, দুইটি দেশের (মালয়েশিয়া এবং হংকং-চায়না) সাথে Mutual Legal Assistance Treaty (ML.AT) চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে; (ঙ) বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধারে আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স এবং যৌথ তদন্ত দলের সমন্বয় কার্যক্রম আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে বিএফআইইউ এর অধীনে Stolen Asset Recovery Division গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া, পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম দক্ষ ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের অনুসরণে বাংলাদেশে একটি বিশেষায়িত সংস্থা গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
(চ) বিদেশে অবৈধভাবে পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিদেশী রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে পরামর্শ, কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- International Anti-Corruption Coordination Centre (IACCC), Stolen Asset Recovery (StAR) Initiative of the World Bank and the United Nations Office on Drugs and Crime, International Centre for Asset Recovery (ICAR) Ges U.S. Department of Justice (USDoJ)।
এ ছাড়া পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারে কার্যকর তথ্য বিনিময়ের লক্ষ্যে বাংলাদেশ Global Operational Network of Anti- Corruption Lwa Enforcement Authorities (GlobE Network) এবং Asset Recovery Interagency Network-Asia Pacific (ARIN-AP) এর সদস্যপদ অর্জন করেছে
(ছ) ফৌজদারি (ক্রিমিনাল) মামলার পাশাপাশি সিভিল প্রোসিডিং এর মাধ্যমে বিদেশে পাচারকৃত অর্থ আদায়ের লক্ষ্যে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি কেইস থেকে ৬টি কেইস নির্বাচন করা হয়েছে। নির্বাচিত ঋণগ্রহীতা গ্রুপের বিদেশে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক এবং ১২টি আন্তর্জাতিক অ্যাসেট রিকভারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
(জ) দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকার একটি সুসংগঠিত ও বহুমাত্রিক রেজল্যুশন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে। এই কাঠামোর আইনি ভিত্তি হিসেবে ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬ প্রণীত হয়েছে। এই কাঠামোর আওতায় সমস্যাগ্রস্ত ৫টি ব্যাংক যথা: এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ পিএলসি (এক্সিম ব্যাংক), ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি এবং ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি-কে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি গঠন করা হয়েছে, যা রেজল্যুশন কৌশলের অধীনে গৃহীত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। এই একীভূতকরণের ফলে পাঁচটি ব্যাংকের সকল আমানতকারীর দাবি ও স্বার্থ নতুন ব্যাংকে সংরক্ষিত হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, আমানত সুরক্ষা তহবিলের বিধানের আওতায় নির্ধারিত সীমা পর্যন্ত আমানতকারীর ক্ষতিপুরণ পাওয়ার আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬ এর (ক) আমানত সুরক্ষা তহবিলের বিধানের আওতায় নির্ধারিত সীমা পর্যন্ত আমানতকারীর মাধ্যমে সরক্ষিত আমানতের পরিমাণ সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা হতে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর আমানতকারীরা ইতোপূর্বে আমানত সুরক্ষা আইনের আওতাভুক্ত ছিল না, বর্তমানে তাদেরকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।



