কৃষিকে রফতানিমুখী খাতে রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
তিনি বলেন, রাসায়নিক বালাইনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই সময়ের দাবি হলো জৈব বালাইনাশকের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ানো এবং বালাইনাশক ব্যবস্থাপনাকে আরো বিজ্ঞানভিত্তিক করা।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাজধানীর ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত বালাইনাশক কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির (পিট্যাক) ৯০তম (বিশেষ) সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো: আব্দুছ ছালামের সভাপতিত্বে সভায় কৃষি সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো: আব্দুর রহিম, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নিয়ম অনুযায়ী বছরে দুইবার পিট্যাক এবং চারবার সাব-পিট্যাক সভা হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘ বিরতির পর এ বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নভেম্বরে পিট্যাক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে এ ধরনের সভা নিয়মিত আয়োজন এবং সিদ্ধান্তগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি।
শুধু পোকা মরলেই হবে না
কৃষিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে পেস্টিসাইড মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রধানত দেখা হয় তা পোকা দমন করতে পারছে কি না। কিন্তু এখন সময় এসেছে এর পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত প্রভাবকে সমান গুরুত্ব দেয়ার।
তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু দেখব না পোকা মরছে কি না। দেখতে হবে এর ফলে ফসল, মাটি, পানি, বায়ু ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব পড়ছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।’
মন্ত্রী বলেন, ‘মাটি ও জলজ বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য বজায় রেখে বালাইনাশক উৎপাদন, অনুমোদন, বিপণন ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একইসাথে জৈব বালাইনাশক এবং প্রাকৃতিকভাবে কীটপতঙ্গ দমন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।’
রফতানি বাড়াতে নিরাপদ খাদ্যের বিকল্প নেই
কৃষিকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি উল্লেখ করে মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘কৃষিকে শিল্পায়িত ও রফতানিমুখী করা গেলে অর্থনীতির ভিত্তি আরো শক্তিশালী হবে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য প্রথম শর্ত হলো নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন।’
তিনি বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশ বাংলাদেশের কৃষিপণ্য আমদানিতে আগ্রহী। কিন্তু তারা জানতে চায় এসব পণ্য তাদের নাগরিকদের জন্য কতটা নিরাপদ। সেই আস্থা অর্জন করতে না পারলে রফতানি সম্প্রসারণ সম্ভব হবে না।’
মন্ত্রী আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের আলো, বাতাস, বৃষ্টি ও মাটি বিশ্বের সেরা মানের কৃষিপণ্য উৎপাদনের উপযোগী। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে আমরা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি।’
মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়নের তাগিদ
পেস্টিসাইডের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হলে মাটি ও খাদ্যকে দূষণমুক্ত রাখতে হবে। বর্তমানে শিশুর শরীরেও হেভি মেটালের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাই বাজারজাতের আগে পেস্টিসাইড পরীক্ষা ও অনুমোদন প্রক্রিয়াকে আরো কার্যকর করতে হবে।’
আইন আছে, বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ
কৃষি সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, ‘মাটি ও মানুষকে রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বালাইনাশক অনুমোদনের সময় যে উপাদান ও মানদণ্ডের কথা বলা হয়, মাঠপর্যায়ে তা যথাযথভাবে অনুসরণ হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে আরো কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্যের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে জাতিকে মুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।’
জৈব বালাইনাশকের নিবন্ধন সহজ করার আহ্বান
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো: আব্দুর রহিম বলেন, ‘পেস্টিসাইড ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে এর মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।’
তিনি জানান, ‘দেশে বর্তমানে ১০৪টি বায়োপেস্টিসাইড নিবন্ধিত রয়েছে, যার মধ্যে ২৬টি দেশীয়ভাবে উদ্ভাবিত। তবে জৈব বালাইনাশকের নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরো সহজ করা প্রয়োজন। উদ্যোক্তারা কোথায় এবং কিভাবে তথ্য জমা দেবেন, সে বিষয়ে একটি কার্যকর কাঠামোও গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।’
নিষিদ্ধ বালাইনাশক অপসারণের দাবি
সভায় বিএসটিআইয়ের প্রতিনিধিরা বাজারে থাকা নিষিদ্ধ বালাইনাশক দ্রুত অপসারণ, সব ধরনের বালাইনাশকের মূল্য নির্ধারণ এবং বিদ্যমান আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনের দাবি জানান।



