দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখে। রাজধানী ঢাকাতে শুধু ৪৮ হাজারের বেশি চার্জিং পয়েন্ট আছে। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তে থাকা এসব বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান একদিকে সাধারণ মানুষের সহজ ও সাশ্রয়ী যাতায়াতের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা, যানজট ও পরিবেশের ওপর তৈরি করছে বাড়তি চাপ। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এসব যান চার্জ দেয়ায় বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
শুধু তাই নয়, রাজধানীতে প্রতিদিন আরো প্রায় ৩০০টি অটোরিকশা যুক্ত হচ্ছে বলে সংসদে জানিয়েছেন সংরক্ষিত মহিলা আসন-৪-এর সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু। বিপুলসংখ্যক এসব যানবাহনের অনেকগুলোরই নেই নিবন্ধন ও নাম্বার প্লেট। ফলে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে স্থাপিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর ক্যামেরায় শনাক্ত হলেও তাদের বিরুদ্ধে জরিমানা কার্যকর করা যাচ্ছে না।
সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ বিধিতে দেয়া জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন নোটিশের জবাবে এসব তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। ‘নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশা চলাচল প্রসঙ্গে’ নোটিশটি দেন রেহানা আক্তার রানু। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৫ শতাংশের বেশি চাহিদা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও অনুরূপ বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান নগর ও গ্রামীণ পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। কম ভাড়া, সহজলভ্যতা ও স্বল্প দূরত্বে দ্রুত যাতায়াতের কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এসব যান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে দ্রুত ও অনেকাংশে অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। দেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার রয়েছে। এসব যানবাহনের দৈনন্দিন বিদ্যুৎ চাহিদা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ বা তারও বেশি হতে পারে বলে জানান মন্ত্রী।
বিপুলসংখ্যক যান একসাথে চার্জ দেয়ায় স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। অনুমোদিত বা আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগের বাণিজ্যিক ব্যবহার, ট্রান্সফর্মার ও বিতরণ লাইনে বাড়তি লোড এবং পিক সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির মতো সমস্যাও দেখা দিচ্ছে।
ঢাকায় অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট ৪৮ হাজারের বেশি
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা মাত্র প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। বিপরীতে শুধু ঢাকাতেই ৪৮ হাজারের বেশি অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে বলে সরকারের ধারণা। এসব অবৈধ চার্জিং পয়েন্টে বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে জাতীয় গ্রিড ও স্থানীয় বিতরণ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। একইসাথে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
ঢাকায় প্রতিদিন ৩০০ নতুন অটোরিকশা
সংসদে নোটিশের ওপর বক্তব্য দিতে গিয়ে রেহানা আক্তার রানু বলেন, রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা চলাচলের পাশাপাশি প্রতিদিন আরো প্রায় ৩০০টি অটোরিকশা যুক্ত হচ্ছে। তার দাবি, অটোরিকশার চার্জিং খাতে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে, যা লোডশেডিংয়ের অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, বিদ্যুতের খুঁটি থেকে অবৈধভাবে সংযোগ নিয়ে চার্জিংয়ের কারণে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে না।
তবে অটোরিকশার সাথে বিপুল মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত উল্লেখ করে তিনি বিকল্প পরিকল্পনা ছাড়া এসব যান জব্দ, ডাম্পিং বা চালকদের হয়রানি না করার আহ্বান জানান।
এআই ক্যামেরা বাড়ছে, ধরা পড়ছে না নাম্বার প্লেটহীন রিকশা
রেহানা আক্তার রানু বলেন, সময়ের সাথে রাজধানীর সড়কে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন এলাকায় এআই নির্ভর ট্রাফিক ক্যামেরা স্থাপনের পর লালবাতি অমান্য, লেন পরিবর্তন ও নির্ধারিত গতিসীমা লঙ্ঘনের মতো অনিয়ম কমেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে বর্তমানে ৫০টি এআই ক্যামেরা চালু রয়েছে। এসব ক্যামেরা যানবাহনের নাম্বার প্লেট শনাক্ত করে কেন্দ্রীয় সার্ভারে তথ্য পাঠায়। পরে ওই তথ্যের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানা করা হয়।
কিন্তু নাম্বার প্লেটবিহীন বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা কার্যকর করা যাচ্ছে না। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে এসব যান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এরই মধ্যে রমনা ও তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগে আরো ২০০টি এআইভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপনের কার্যক্রম চলছে। পর্যায়ক্রমে ঢাকা মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়গুলোতেও এসব ক্যামেরা স্থাপন করা হবে।
দুর্ঘটনায় অটোরিকশার অংশ ১৩.৫৪ শতাংশ
অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯১১ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় যুক্ত যানবাহনের মধ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অংশ ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
অনিবন্ধিত যান, অপ্রশিক্ষিত চালক, ত্রুটিপূর্ণ নকশা, ব্রেক ও আলো ব্যবস্থার ত্রুটি, অতিরিক্ত গতি এবং মহাসড়কে স্বল্পগতির যান চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে জানান তিনি।
লেড-অ্যাসিড ব্যাটারিতে পরিবেশঝুঁকি
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির অনিরাপদ ব্যবস্থাপনা ও অনানুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের কারণে শিষা দূষণ, মাটি ও পানি দূষণ তৈরি হচ্ছে। এতে বিশেষ করে শিশু শ্রমিকদের গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। কৃষি ও পোলট্রি শিল্পও এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে নতুন নীতিমালায় পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
নিবন্ধন, রুট ও চালকের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক
অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে অটোরিকশাকে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার আওতায় আনতে নীতিমালা ও বিধি প্রণয়নের কাজ এগিয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। শিগগিরই তা বাস্তবায়ন করা হবে।
নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে অনুমোদিত অটোরিকশাকে নাম্বার প্লেট ও কিউআর কোডের মাধ্যমে শনাক্ত করা হবে। চালকদের নিবন্ধনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে পর্যায়ক্রমে লাইসেন্সের আওতায় আনা হবে। নির্ধারণ করা হবে চলাচলের সড়ক। যানবাহনের সংখ্যা, রুট, চালক এবং চলাচল ব্যবস্থাপনাও নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
একটি নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে যাতে একাধিক অটোরিকশা চালানো না যায়, সে ব্যবস্থাও করা হবে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে ব্যাটারি ও যানবাহন ট্র্যাক করার ব্যবস্থার কথাও জানান মন্ত্রী।
প্রধান সড়ক থেকে সরানোর প্রস্তাব
রেহানা আক্তার রানু বলেন, তিনি অটোরিকশা নিষিদ্ধ করার কথা বলেননি; বরং চলাচল নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। অটোরিকশার সাথে বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। তাই বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া বাহন জব্দ, ডাম্পিং বা চালকদের পুলিশি হয়রানি করা উচিত নয়।
তার প্রস্তাব—প্রধান সড়ক থেকে অটোরিকশা সরিয়ে অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচলের সুযোগ দেয়া, অঞ্চলভিত্তিক চলাচলের ব্যবস্থা করা, বিআরটিএর নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা এবং সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে চার্জিংয়ের ব্যবস্থা করা।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর সাথে এ বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন। নীতিমালা ও বিধি প্রণয়নের অগ্রগতি হয়েছে। কর্মসংস্থান যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, পরিবেশ রক্ষা হয় এবং যানবাহনের শৃঙ্খলা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হয়—সব দিক বিবেচনায় নিয়েই নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হবে।



