ঢাকার বুকে এক রক্তাক্ত ইতিহাস বাহাদুর শাহ পার্কের গল্প

প্রতিদিন সকালে এখানে অনেকে হাঁটতে আসেন, বিকেলে তরুণেরা আড্ডা দেয়, আর বেঞ্চিতে বসে গল্প করেন প্রবীণরা। কিন্তু এই শান্ত পার্কটির মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে আজ থেকে প্রায় ১৭০ বছর আগের এক রক্তক্ষয়ী এবং গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।

  • ফারজানা খাতুন

বুড়িগঙ্গার কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার। চারপাশের তীব্র যানজট, হকারদের হাকডাক আর মানুষের কোলাহলের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ‘বাহাদুর শাহ পার্ক। অনেকে ভিক্টোরিয়া পার্ক নামেও চিনে থাকে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে দু’টি নামেই পরিচিত। নাম দু’টির পেছনে লুকিয়ে আছে এক রক্তাক্ত ইতিহাস। প্রতিদিন সকালে এখানে অনেকে হাঁটতে আসেন, বিকেলে তরুণেরা আড্ডা দেয়, আর বেঞ্চিতে বসে গল্প করেন প্রবীণরা। কিন্তু এই শান্ত পার্কটির মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে আজ থেকে প্রায় ১৭০ বছর আগের এক রক্তক্ষয়ী এবং গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।

Victoria Park-03

আড্ডার মাঠ থেকে 'ভিক্টোরিয়া পার্ক'

আগে এই পার্কটির নাম ছিল ভিক্টোরিয়া পার্ক। ভিক্টোরিয়া পার্ক নামকরণ করা হয়েছিল ব্রিটেনের রানী ভিক্টোরিয়ার নামে। কারণ ১৮৫৮ সালের তিনি ব্রিটেনের শাসন ক্ষমতা হাতে নেন। তার স্মরণে একটি ঘোষণাপত্র পাঠ করেন তৎকালীন ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার। একে স্মৃতি হিসাবে ধরে রাখতে এই পার্কের নাম করা হয় ভিক্টোরিয়া পার্ক।

তৎকালীন সময়ে ঢাকার নবাব পরিবারের সঙ্গে ব্রিটিশ শাসকদের সুসম্পর্ক ছিল। বিশেষ করে নবাব খাজা আবদুল গণি ও নবাব খাজা আহসানুল্লাহ খান বাহাদুর। ১৯৫৭ সালে, সিপাহী বিদ্রোহের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ‘ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট’ (ডিআইটি)-এর উদ্যোগে এই স্থানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। এই পার্কের স্মৃতিসৌধটি চারটি পিলারের উপর দাঁড়ানো চারকোনা একটি কাঠামো। উপরে রয়েছে একটি ডোম।

নবাব পরিবার পার্কটি সংস্কার করতে অর্থ দান করেছিলেন। এ সময় খাজা আহসানুল্লাহর ছেলে খাজা হাফিজুল্লাহ অল্প বয়সে মারা গেলে তার স্মরণে ১৮৮৪ সালে একটি স্মৃতি ফলক পার্কে নির্মাণ করেন ব্রিটিশ রাজের কর্মচারীরা। যেটা পার্কের দক্ষিণ দিকে দেখতে পাওয়া যায়।

Victoria Park

ভিক্টোরিয়া পার্কের আদি নাম ছিল আণ্টাঘর। তখন এই পার্ক ঘিরে বাস করত বহু আর্মেনীয় পরিবার। পার্কের পরিধিও ছিল অনেক তখন এখানে অনেক গোলাপ গাছের বাগান ছিল। গোলাপের চাষ হতো এখানে। বিভিন্ন রঙের গোলাপ ফুটে থাকত সেখানে। ইংরেজরা এখানে আমোদ ফুর্তি করত। তাদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল একটি ক্লাব। বর্তমানে সেটি আর নেই।

পার্কটিকে আণ্টাঘর নামে ডাকত এলাকার লোকজন। অনেকে বলেন পার্ক ঘিরে ভাসমান ডিমের দোকান ছিল। ঢাকাইয়াদের অনেকে ডিমকে আন্ডা বলত। সেই আন্ডা ঘর থেকে নাম হয়েছে আণ্টাঘর।

আরেকটি ইতিহাস আছে, আঠারো শতকের শেষের দিকে এখানে ঢাকার আর্মেনীয়দের বিলিয়ার্ড ক্লাব ছিল। যাকে স্থানীয়রা নাম দিয়েছিল আণ্টাঘর। বিলিয়ার্ড বলকে স্থানীয়রা আণ্টা নামেঅভিহিত করত। সেখান থেকেই এসেছে ‘আণ্টাঘর’ কথাটি। ক্লাব ঘরের সাথেই ছিল একটি মাঠ বা ময়দান যা আণ্টাঘর ময়দান নামে পরিচিত ছিল।

১৮৫৭ সালের সেই রক্তাক্ত সকাল

কিন্তু এই পার্কের আসল ইতিহাস লুকিয়ে আছে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের ট্র্যাজেডিতে। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহ হয়। সেই বিদ্রোহ দমনে ইংরেজ সেনারা ওই বছর ২২ নভেম্বর লাল বাগের কেল্লা আক্রমণ করে। এতে ১১ জন সিপাহিকে তারা বন্দি করে। বিদ্রোহ দমন করার পর ব্রিটিশরা মেতে ওঠে এক নৃশংস উল্লাসে। বন্দি সিপাহিদের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। এরপর ঢাকার মানুষকে ভয় দেখাতে, এই ভিক্টোরিয়া পার্কের চারপাশের গাছের ডালে লাইনে দাঁড়িয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় বন্দি সিপাহিদের লাশ।

প্রহসনমূলক বিচারে সিপাহিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাদের এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় এই পার্কে। তখন এই পার্কে বহু গাছ ছিল। সিপাহিদের লাশ দাফন না করে গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখেছিল ইংরেজরা। উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে ভয় দেখানো যাতে ভবিষ্যতে কেউ বিদ্রোহ না করে।

প্রবীণদের মুখে শোনা যায়, দিনের পর দিন সেই গাছে সিপাহিদের মৃতদেহগুলো ঝুলছিল। সেই নারকীয় দৃশ্য দেখে ভয়ে ও আতঙ্কে সাধারণ মানুষ এই পার্কের রাস্তা দিয়ে হাঁটাচলা পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছিল। শত শত তরুণের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল এই পার্কের মাটি।

ভিক্টোরিয়া থেকে 'বাহাদুর শাহ পার্ক'

সিপাহি বিদ্রোহের ঠিক একশ’ বছর পর, ১৯৫৭ সালে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (DIT) এই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পার্কটির সংস্কার করে। ভারতের শেষ মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরের নামানুসারে পার্কের নতুন নামকরণ করা হয় ‘বাহাদুর শাহ পার্ক’। কারণ, এই বাহাদুর শাহ জাফরই ছিলেন ১৮৫৭ সালের সিপাহিদের ঘোষিত নেতা।

বর্তমানের রূপ ও স্মৃতিস্তম্ভ

এই পার্ক ঘিরে রয়েছে বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যার বেশিরভাগ ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কবি নজরুল কলেজ ও ঢাকা মুসলিম গভর্মেন্ট হাইস্কুল পার্ক লাগোয়া।

মানে পার্কটি ঘিরে রয়েছে এই তিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তবে পার্ক এলাকার কাছাকাছি রয়েছে আরো কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেমন পার্কের পূর্ব দিকে রয়েছে ঐতিহাসিক সেন্ট গ্রেগরি হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ ও সেন্ট ফ্রানসিস জেভিয়ার্স গার্লস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, মহানগরী কলেজ, সেন্ট্রাল স্কুল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, পশ্চিম দিকে শাঁখারি বাজারের মুখে রয়েছে প্রোগজ হাইস্কুল বর্তমান নাম প্রোগজ ল্যাবরেটরি হাইস্কুল। দক্ষিণে আছে ঢাকা কলেজিয়েট গভর্নমেন্ট হাইস্কুল ও বাংলাবাজার গার্লস হাইস্কুল। আজকের বাহাদুর শাহ পার্কে ঢুকলেই চোখে পড়বে পার্কের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ স্মৃতিস্তম্ভটি। ওপরে একটি চারকোনা স্তম্ভ, যা সিপাহি শহীদদের স্মরণে নির্মিত। পার্কের উত্তর পাশে রয়েছে ঢাকার নবাব খাজা আব্দুল গনির বড় ছেলে খাজা হাফিজুল্লাহর স্মরণে তৈরি আরেকটি স্মৃতিসৌধ।

Victoria Park-04

পুরাণ ঢাকার লোকজনের চাপে এখন পার্কে বিশ্রাম নেওয়া কঠিন। সকালে ও সন্ধ্যায় বহু লোক পার্কে অবস্থান করে। হাঁটাহাঁটি করে। এছাড়া ছুটির দিনগুলোতে পার্ক ভরে যায়। তিল পরিমাণ জায়গা থাকে না। এছাড়া সিটি কর্পোরেশনের অনুমতি নিয়ে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে এই বাহাদুর শাহ পার্কে। রাজনৈতিক কর্মসূচিও পালন করা হয় পার্ককে কেন্দ্র করে।

আজকের পার্কটি হয়তো অনেক আধুনিক হয়েছে, চারপাশে লোহার গ্রিল দেওয়া হয়েছে, বসার বেঞ্চ হয়েছে। কিন্তু পার্কের বিশাল ও প্রাচীন গাছগুলোর দিকে তাকালে আজও যেন সেই ১৭০ বছর আগের সিপাহিদের আত্মত্যাগের ইতিহাস চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

বাহাদুর শাহ পার্ক কেবল প্রাতঃভ্রমণ বা আড্ডার জায়গা নয়; এটি আমাদের স্বাধীনতার প্রথম সূর্যসন্তানদের রক্তে ভেজা এক পবিত্র স্মারক। পুরান ঢাকার ব্যস্ত নাগরিক জীবনের মাঝে এই পার্কটি প্রতিদিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আজ আমরা যে স্বাধীন বাতাসে নিশ্বাস নিচ্ছি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে গিয়েছিলেন এই মাঠেই প্রাণ দেওয়া নাম না জানা সেই বীর সিপাহিরা।

লেখক: নয়া দিগন্তের ইন্টার্ন শিক্ষার্থী।