আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে নয় দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির দাবি, স্থানীয় নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের পদধারীদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেয়া যাবে না এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে।
আজ মঙ্গলবার আগারগাওস্থ নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশনের সাথে বৈঠকে এসব দাবি তুলে ধরেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন। নির্বাচন কমিশনের সাথে বৈঠকে জামায়াতের ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদলে ছিলেন দলের নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও নির্বাচন কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ ইজ্জতুল্লাহ, নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন, নির্বাচন কমিটির সদস্য আব্দুর রব, নির্বাচন কমিটির সেক্রেটারি ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন এমপি এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির সদস্য ইয়াসিন আরাফাত। বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের অন্য কমিশনার ও সচিব ছিলেন।
ব্রিফিংয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার গণমাধ্যমকে বলেন, নয় দফা দাবি লিখিতভাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। কমিশনের সাথে তাদের বৈঠক ‘অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ’ হয়েছে বলেও জানান।
তিনি বলেন, আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনের সম্ভাব্য তফসিল ঘোষণার প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরামর্শ, সুপারিশ ও দাবি নিয়ে তারা ইসির সাথে বৈঠক করেন। এর আগে, প্রায় এক মাস আগে কমিশনের সাথে সাক্ষাৎ করে একই ধরনের কিছু দাবি জানানো হয়েছিল। সেসব দাবির কতটা বাস্তবায়ন বা বিবেচনায় নেয়া হয়েছে, তার ফলোআপ করতেই এই সাক্ষাৎ।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থিতার সুযোগ
জামায়াতের প্রধান দাবিগুলোর একটি হলো এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া। গোলাম পরওয়ারের দাবি, দেশের বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৩০ হাজারের বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন নির্বাচনে ভোট দিতে ও রাজনীতিতে অংশ নিতে পারছেন। এমনকি সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এমপিওভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। তার অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন নিজেদের একটি সভায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য করার বিষয়ে একটি সুপারিশ অনুমোদন করে পাঠিয়েছে। এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ওই সুপারিশ বাতিলের দাবি জানিয়েছে জামায়াত।
গোলাম পরওয়ার বলেন, একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন, কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না- এ ধরনের বিধান বৈষম্যমূলক। এটি সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের সমতা ও বৈষম্যহীনতার যে অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, তার সাথে সাংঘর্ষিক।
নিষিদ্ধ দলের পদধারীদের নির্বাচনে অযোগ্য করার দাবি
তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক কার্যক্রম সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ থাকলে সেই দলের পদধারী নেতাদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেয়ার দাবিও জানিয়েছি। তিনি বলেন, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কোনো নেতা নির্বাচনে অংশ নিলে সেটিও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হবে। এ কারণে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কোনো পদধারী ব্যক্তিকে স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া উচিত নয় বলে তারা নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছেন।
ইসির অতিরিক্ত সচিব শামসুল আলমকে নিয়ে আপত্তি
নির্বাচন কমিশনে সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া অতিরিক্ত সচিব শামসুল আলমকে নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে জামায়াত। গোলাম পরওয়ারের দাবি, শামসুল আলম সরাসরি একটি রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং বিএনপির নির্বাচনবিষয়ক একটি সাব-কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ওই কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, এমন রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকা একজন ব্যক্তিকে নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়া ‘রাজনৈতিক নিয়োগ’ এবং তা সংবিধান ও আইনের সাথে সাংঘর্ষিক।
গোলাম পরওয়ার বলেন, এ বিষয়ে তারা আগেও নির্বাচন কমিশনের কাছে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। কমিশন জানিয়েছে, তারা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ নয়, তবে জামায়াতের উদ্বেগের বিষয়টি সরকারের কাছে জানাবে।
তিনি বলেন, ইসির পক্ষ থেকে তাদের জানানো হয়েছে যে জামায়াতের উত্থাপিত অভিযোগ ও উদ্বেগ সম্পর্কে তারা অবগত হয়েছে এবং বিষয়টি সরকারকে জানানো হবে।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশাসক নিয়োগে আপত্তি
সম্প্রতি বিভিন্ন উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে রাজনৈতিক পরিচয়সম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগের বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে জামায়াত।
জামায়াত নেতা বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান, জেলা সভাপতি, উপজেলা সভাপতি বা দলীয় পদধারী ব্যক্তিদের বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে এসব ব্যক্তিকে প্রার্থী করার প্রস্তুতি হিসেবে তাদের এসব পদে বসানো হয়েছে।
তার অভিযোগ, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তারা সরকারি অর্থ, এডিপি ও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যবহারের মাধ্যমে নির্বাচনী মাঠ নিজেদের অনুকূলে প্রস্তুত করার সুযোগ পেতে পারেন। এ কারণে বর্তমানে যারা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছে জামায়াত।
তিনি বলেন, শুধু তফসিল ঘোষণার পর পদত্যাগ করলেই যেন নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ না দেয়া হয়। তফসিল ঘোষণার আগে যিনি প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন, তিনি পদত্যাগ করলেও অন্তত ওই স্থানীয় নির্বাচনে তার প্রার্থিতার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
মন্ত্রী-এমপিদের প্রচারণায় অংশগ্রহণ নয়
স্থানীয় নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণায় মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিয়েও নতুন আচরণবিধিতে সুনির্দিষ্ট বিধান রাখার দাবি জানিয়েছে দলটি। তিনি বলেন, আগের আচরণবিধিতে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান ছিল না। তারা নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি বিবেচনায় নেয়ার অনুরোধ করেছেন। কমিশন এ বিষয়ে নতুন আচরণবিধিতে প্রয়োজনীয় বিধান রাখার বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে তাদের জানিয়েছে।
‘কিছু দাবি কমিশন ইতোমধ্যে মেনেছে’
জামায়াতের নয় দফা দাবির বিষয়ে নির্বাচন কমিশন কিছু দাবি ইতোমধ্যে বিবেচনায় নিয়েছে বলে জানিয়েছেন গোলাম পরওয়ার।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রায় এক মাস আগে একই ধরনের দাবি নিয়ে তারা কমিশনে এসেছিলেন। এরপর কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না পাওয়ায় আবারো তারা বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে এসেছেন। এবারের বৈঠকে কমিশন জানিয়েছে, তাদের উত্থাপিত কিছু বিষয় বিবেচনায় নেয়া হয়েছে এবং কিছু বিষয়ে কাজ চলছে। তবে কিছু বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার সীমিত বলেও জানিয়েছেন কমিশনের কর্মকর্তারা। গোলাম পরওয়ার বলেন, কিছু বিষয়ে কমিশন জানিয়েছে, সেগুলো সরকারের করণীয়; কমিশন শুধু সরকারের কাছে পরামর্শ দিতে পারে।
‘এখনই নির্বাচন বর্জনের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি’
নির্বাচন কমিশন তাদের দাবিগুলো না মানলে জামায়াত স্থানীয় নির্বাচন বর্জন করবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এখনই নির্বাচন বর্জনের কথা বলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
তিনি বলেন, তারা এখনো নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থাশীল। তবে নির্বাচন কমিশনের সাথে আলোচনার সময় তাদের মধ্যে এক ধরনের ‘অসহায়ত্ব’ লক্ষ্য করা গেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, ক্ষমতায় দলীয় সরকার থাকায় নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ থাকতে পারে এবং কমিশনের কর্মকর্তারা সব বিষয়ে ‘মন খুলে’ কথা বলতে পারেন না- এটি তাদের পর্যবেক্ষণ।
শামসুল আলমের নিয়োগ বহাল থাকলে অবস্থান কী হবে?
নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব শামসুল আলমের নিয়োগ বহাল থাকলে জামায়াত কী করবে- এমন প্রশ্নের জবাবে গোলাম পরওয়ার বলেন, তারা প্রতিবাদ ও আপত্তি জানিয়ে যাবেন।
তিনি দাবি করেন, জামায়াত বিষয়টি উত্থাপনের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় প্রকাশ হয়েছে। নির্বাচন কমিশনও তাদের জানিয়েছে, বিষয়টি সম্পর্কে তারা পরবর্তীতে বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য পেয়েছে এবং সরকারের কাছে জামায়াতের উদ্বেগের কথা জানাবে।



