বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশী নারী শ্রমিকদের বড় একটি অংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে জাতীয় সংসদে। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংসদ সদস্যরা নারীকর্মীদের নিরাপত্তা ও অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরু জানিয়েছেন, প্রবাসীদের অভিযোগ ও সেবা নিশ্চিত করতে ১৬১৩৫ নম্বরে টোল-ফ্রি হটলাইন চালু রয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সেফ হোম পরিচালনা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে অ্যাজেন্সির বাইরে সরাসরি কর্মী পাঠানোর জন্য ‘অ্যাডভান্স পুল’ গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।
সোমবার (৮ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদেও বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে বিরোধী দলীয় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এ তথ্য জানান। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
মারদিয়া মমতাজ বলেন, ‘২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিন লাখের বেশি নারী শ্রমিক বিদেশে গেছেন। তাদের অনেকেই নিরাপত্তাহীনতা, বেতন বঞ্চনা ও চুক্তি লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছেন।’ এমনকি প্রায় ৯৪ শতাংশ নারী শ্রমিক যৌন নির্যাতনের শিকার হন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নারী কর্মীদের জন্য ২৪ ঘণ্টার হটলাইন, সেফ হোম, বিমা সুবিধা ও নিয়োগকর্তা যাচাইয়ের মতো সুরক্ষা ব্যবস্থা আরো জোরদার করা হবে কিনা, তা জানতে চান তিনি।
জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিদেশে অবস্থানরত নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ থেকে ১৬১৩৫ নম্বরে একটি টোল-ফ্রি হটলাইন পরিচালিত হচ্ছে। দেশের বাইরে থেকেও প্রবাসীরা যেকোনো অভিযোগ বা সমস্যার কথা সেখানে জানাতে পারেন। অভিযোগ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়। পাশাপাশি বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোও নিয়মিত সহায়তা দিয়ে থাকে।’
তিনি বলেন, ‘অতীতে অনেক দেশের সাথে শ্রমবিষয়ক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) না থাকলেও এখন বিভিন্ন দেশের সাথে নতুন চুক্তি হচ্ছে। এর ফলে শ্রমিকদের অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে হয়রানির ঘটনায় প্রতিকার দাবি করা সহজ হয়েছে।’
সেফ হোম প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী জানান, ‘সৌদি আরবে বাংলাদেশের দু’টি সেফ হোম রয়েছে। এছাড়া ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরো কয়েকটি দেশে পর্যায়ক্রমে সেফ হোম পরিচালনা করা হচ্ছে। নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসা নারীকর্মীর সংখ্যাও আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে।’
তিনি বলেন, ‘এখন আমরা নারীকর্মীদের বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে অনেক বেশি সতর্ক। কর্মপরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মানদণ্ড নিশ্চিত হওয়ার পরই তাদের পাঠানো হচ্ছে।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে নূরুল হক নূরু বলেন, ‘আমরা একটি অ্যাডভান্স পুল গঠনের কথা ভাবছি। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়োগকর্তারা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরাসরি কর্মী নিতে পারবেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা কমবে এবং মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তদারকি বাড়বে।’
এদিকে, সম্পূরক প্রশ্নে বিরোধী দলের সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদ প্রবাসী শ্রমিকদের দুর্ভোগ নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখা এই মানুষগুলো বিদেশে গিয়ে নানা ধরনের হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।’
সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি আরো বলেন, ‘অনেক শ্রমিক সর্বস্ব হারিয়ে দেশে ফিরছেন।’ প্রবাসীদের অধিকার সুরক্ষায় সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চান তিনি।
জবাবে প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নূরু বলেন, ‘বিদেশে বাংলাদেশী শ্রমিকদের সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকার দূতাবাসভিত্তিক সেবা জোরদার করেছে। একইসাথে আইনি সহায়তা, অভিযোগ নিষ্পত্তি ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে নানা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’



