প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বর্তমান সরকার কোনো দলের সরকার নয় এটি বাংলাদেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সরকার। যারা ভোট দিয়েছেন তাদের যেমন সরকার, যারা ভোট দেননি তাদেরও সরকার। দল, মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিক সরকারের সব সুবিধা সমানভাবে পাবেন। আমরা সকলের জন্য কাজ করতে চাই। বাংলাদেশের নাগরিক হলেই সে এই সকল সুবিধা পাবে।
বুধবার (১৭ জুন) মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের তৃতীয় পর্যায়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে এই দেশকে স্বাধীন করেছিল এই দেশের জনগণ। বিদেশ থেকে কেউ এসে স্বাধীনতা এনে দেয়নি। একইভাবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছেও এই দেশের সাধারণ মানুষ। ছাত্র, জনতা, নারী-পুরুষ সকলে মিলে রাজপথে নেমে এসে। কাজেই দেশকেও গড়ে তুলবে জনগণ।
তিনি আরো বলেন, এই দেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত। এই ৪০ কোটি হাত যদি অলস হয়ে পড়ে থাকে, তাহলে দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন কখনো সম্ভব হবে না। দেশ গড়তে হলে সরকার ও জনগণকে একযোগে কাজ করতে হবে। সরকারের যেমন দায়িত্ব আছে উন্নয়ন কাজ করার, শিক্ষার ব্যবস্থা করার, নারীদের নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার এবং মানুষের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করার ঠিক একইভাবে জনগণকেও তাদের নিজস্ব দায়িত্ব পালন করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে যখন দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়েছিল, তখন তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন, এই বাংলাদেশের মাটিই তার প্রথম এবং শেষ ঠিকানা। কাজেই এই দেশকে যদি সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়, তাহলে সকলকে হাতে হাত মিলিয়ে একসাথে কাজ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ যখনই ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে যায়, দেশের অর্থনীতি যখনই গতি পেতে শুরু করে, তখনই একটি স্বার্থান্বেষী মহল দেশে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করে। অতীতেও ১৭৩ দিন হরতাল, ভাঙচুর ও অবরোধ দিয়ে দেশের মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করা হয়েছিল। সেই একই মহল আজ আবার বলছে, সরকারকে সময় দেয়া যাবে না। তিনি প্রশ্ন রাখেন, যারা এ কথা বলছে তারা কি জনগণের স্বার্থে কথা বলছে, নাকি নিজেদের স্বার্থে?
সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রশ্নটিকে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, আজকে দেখুন, সংবাদপত্র কোনো খবর ছাপলে সেটি সরকারের পক্ষেই হোক বা বিপক্ষেই হোক সেই সংবাদপত্র কিন্তু ভয় পায় না। সে তার কথা বলে। একইভাবে যেকোনো ব্যক্তি সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে যা-ই বলতে চান, তা নির্ভয়ে বলতে পারছেন।
তিনি আরো বলেন, বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে এই দেশের মানুষের বাকস্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতা সম্পূর্ণরূপে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। ভোটের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল, কথা বলার অধিকার হরণ করা হয়েছিল । সেই অন্ধকার অধ্যায়ের বিরুদ্ধে গত এক যুগ ধরে বাংলাদেশের মানুষ রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। অবশেষে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটে এবং হারানো অধিকার পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই বাকস্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেই আজকে আমরা জনগণের জন্য কাজ করতে পারছি, দেশের জন্য কাজ করতে পারছি। তিনি স্পষ্ট করেন, এই গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকলে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণসহ সরকারের কল্যাণমুখী কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বর্তমান সরকার হচ্ছে দলমত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার সরকার। এই জন্যই আমরা বলি করবো কাজ গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ একই সাথে হচ্ছে সবার জন্য বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, আজকের দিনটি আমার জন্য আনন্দের দিন। আমরা বলেছিলাম ফ্যামেলি কার্ড দেব। এটা আমাদের নির্বাচনী ওয়াদা ছিল। আজকেই এর বাস্তবায়ন করতে পারলাম। নারী চা শ্রমিকদের হাতে কার্ড দিতে পেরে খুবই ভালো লাগছে। দু:স্থ, অসহায় ও মেধাবী ছাত্রদের সহায়তা, গরীবদের চিকিৎসা সাহায্য, কৃষকদের কৃষি কার্ড দিয়েছি আমরা। প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চাদের হাতে নতুন জামা ও স্কুল ব্যাগ তুলে দেব।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, দেশের মানুষ শান্তি চায়, ভালোভাবে বেঁচে থাকতে চায়। বর্তমান সরকার আপনাদের জন্য কাজ করছে, দেশের জন্য কাজ করছে। এই যে আমরা ফ্যামেলি কার্ড দিলাম এটা সব ধরণের মানুষ পেয়েছে না? আমরা সরকার জনগণের অর্থ দিয়ে জনগণের জন্য কাজ করতে চাই। জনগণের অর্থ যাতে সঠিকভাবে জনগণের জন্য এবং দেশের ব্যবহৃত হয়।
প্রধানমন্ত্রী জনগণকে উদ্দেশ্য করে বলেন, অতীতে আমরা দেখেছি বিএনপিকে একমুহূর্ত শান্তিতে থাকতে দেয়া যাবে না। আজকে আবার দেখছি বিএনপির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে যারা একত্রিত হয়ে আন্দোলন আন্দোলন খেলা খেলেছিল, যারা ষড়যন্ত্র করেছিল, গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে, মানুষের ভোটের অধিকারের বিরুদ্ধে সেই তারা এখন আবার বলছে সরকারকে সময় দেয়া যাবে না। যারা বলে সরকারকে সময় দেয়া যাবে না, তারা কি জনগণের পক্ষে কথা বলে না বিপক্ষে কথা বলে? তাই এই ব্যাপারে জনগণকে সজাগ থাকতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার বাংলাদেশের ৪ কোটি পরিবারের কাছে ফ্যামেলি কার্ড পৌঁছে দিতে চায়, বাংলাদেশের ৩ কোটি কৃষকের কাছে কৃষক কার্ড তুলে দিতে চায়, প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চাদের হাতে নতুন জামা ও স্কুল ব্যাগ তুলে দিতে চায়, ইমাম ও অন্যান্য ধর্মীয় গুরুদের নূন্যতম সম্মানির ব্যবস্থা করে দিতে চায়, এই দেশের খালগুলোকে খনন এবং পূর্ণ খনন করতে চায়, এই দেশের মানুষ বুক ভরে শ্বাস নিতে চায় তার জন্য বৃক্ষরোপণ করতে চায়। আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগাতে চায়।
তিনি বলেন, আমরা যে বাজেট উপস্থাপন করেছি, তাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যের ট্যাক্স তুলে নিয়েছি, যাতে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে চলে আসে।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, যারা বিএনপি করে, যারা আমার দলের দলীয় নেতাকর্মী, যারা শহীদ জিয়ার সৈনিক, খালেদা জিয়ার সৈনিক আমরা সকল সময় একটি কথা বলি আমাদের শক্তির উৎস জনগণ। আমাদের রাজনীতিও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে। এই জনগণই আমাদেরকে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সরকার গঠনে সহযোগিতা করেছে। এই জনগণ সাথে ছিল বলে গত এক যুগের আন্দোলন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সফল হয়েছে। নির্বাচনের আগে আমরা দেশের মানুষের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, ম্যানোফেস্টো দিয়েছিলাম তা ছিল বিএনপির ম্যানোফেস্টো। নির্বাচনের ফলাফলের পরে এটি প্রমাণ করেছে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ম্যানোফেস্টো।
তিনি বলেন, জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি আগামী ৫ বছর পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করবে। জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রæতি পালন করতে কাজ করবে। তাহলে আমার প্রশ্ন জনগণের রায়ের বিরুদ্ধে যারা কথা বলে, যারা বলে বিএনপিকে সময় দেওয়া যাবে না তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কি করা উচিৎ? তাদের বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে হবে। মনে আছে তো ৭১ কি করেছিল? ৮৬ তে কি করেছিল? মনে আছে তো এর মধ্যে একযুগের যে আন্দোলন চলেছিল সেই আন্দোলনে তাদেরকে কোথাও কিন্তু আমরা দেখি নাই। আজকে যদি আন্দোলনের শহীদদের তালিকা বের করা হয় দেখা যাবে যে ছাত্রটি মারা গিয়েছে সে ছাত্রদলের এক কর্মী, যে ছাত্রটি গুম হয়েছে সে ছাত্রদলের কর্মী, যে যুবকটি মারা গিয়েছে সে যুবদলের কর্মী, যেই যুবকটি গুম হয়েছে যুবদলের কর্মী, যেই মানুষটি বিনা কারণে জেল খেটেছে সে বিএনপির কর্মী, যে মানুষটি মিথ্যা মামলা বয়ে বেড়িয়েছে বছরের পর বছর খোঁজ নিয়ে দেখা যাবে সে শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়ার কর্মী।
মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ থেকে প্রধানমন্ত্রী একযোগে দেশের ২০টি জেলায় ফ্যামেলি কার্ড পাইলটিং কর্মসূচির তৃতীয় পর্যায়ের উদ্বোধন করেন। এসময় প্রধানমন্ত্রী ফ্যামেলি কার্ড বিতরণের পাশাপাশি দুস্থ অসহায়দের সহযোগিতা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাঝে অর্থ সহায়তা, পাহাড়ি নৃ-গোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের মাঝে বৃত্তি প্রদান, চা শ্রমিকদের মাঝে বরাদ্দ ও অসহায় শিক্ষার্থীদের মাঝে বৃত্তি তুলে দেন।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, হুইপ জি কে গৌছ, মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান, মৌলভীবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম শকু, মৌলভীবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য নাসির উদ্দীন আহমেদ মিঠু, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য জহরত আদিব চৌধুরী, জেলা পরিষদ প্রশাসক মিজানুর রহমান, জেলা বিএনপির আহবায়ক ফয়জুল করিম ময়ূন, সদস্য সচিব আব্দুর রহিম রিপন।
এছাড়া উপস্থিত ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য তাহমিনা রুশদীর লুনা, সংসদ সদস্য আব্দুল মালিকসহ দলীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে সন্ধ্যায় মৌলভীবাজারের দুসাই রির্সোটে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সভা হয়। সেখান থেকে তিনি সাবেক সংসদ সদস্য বিএনপি নেত্রী অসুস্থ খালেদা রাব্বানীকে দেখতে যান।



