বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় অপরাধের দণ্ডের মাত্রা নির্ধারণে একটি অভিন্ন, স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত আইনি কাঠামো বিনির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এরই অংশ হিসেবে রোববার (২১ জুন) আইন কমিশনের সম্মেলন কক্ষে ‘ফৌজদারি অপরাধের দণ্ডের মাত্রা নিরূপণ বিষয়ক আইন প্রণয়নের সম্ভাব্যতা যাচাই’ শীর্ষক একটি জাতীয় সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আইন কমিশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি জিনাত আরা।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান বলেন, বর্তমান সরকার যেকোনো নতুন আইন প্রণয়নের শুরুতেই সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে মতবিনিময় সভাকে অগ্রাধিকার দেয় এবং তাদের মতামতকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে।
তিনি আইনি প্রক্রিয়ার ওপর আলোকপাত করে বলেন, ‘একটি খসড়া আইন চূড়ান্তকরণের আগে মন্ত্রিপরিষদ, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ও জাতীয় সংসদে বিস্তারিত পর্যালোচনা সম্পন্ন হয়। এই প্রতিটি স্তরে যদি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের গঠনমূলক মতামত সংযোজিত হয়, তবেই আইনটি আরো কার্যকর, বাস্তবসম্মত ও সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।’
প্রস্তাবিত আইনের বিভিন্ন ধারা ও সংজ্ঞার ওপর নিজস্ব গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশের ‘সেনটেন্সিং গাইডলাইন’ বা দণ্ড নির্ধারণী নির্দেশিকাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বহির্বিশ্বের এই সফল মডেলগুলোকে পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের সামাজিক ও আইনি প্রেক্ষাপটের সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি কার্যকর ও শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইন কমিশনের গবেষণা কর্মকর্তা মোসাম্মাদ মনিরা সুলতানা। উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে দেশের বর্তমান বিচারব্যবস্থার একটি বড় চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশে দণ্ডের মাত্রা বা মেয়াদ নির্ধারণে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট আইনি নির্দেশনার অভাব রয়েছে। এর ফলে অনেক সময় একই ধরনের অপরাধে দণ্ডের ক্ষেত্রে বড় রকমের তারতম্য বা অসঙ্গতি দেখা দিতে পারে। এই আইনি সীমাবদ্ধতাটি অনেক সময় ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে এবং সামগ্রিক বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থাকে প্রভাবিত করে। একটি সুনির্দিষ্ট আইন প্রণীত হলে এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব।
উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে বক্তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দণ্ড নির্ধারণ সংক্রান্ত পৃথক আইন ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা প্রবর্তনের নজির তুলে ধরেন। তারা জানান, আধুনিক বিচারব্যবস্থায় এ ধরনের গাইডলাইন থাকার কারণে রায় প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং ‘পূর্বানুমেয়তা’ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিচারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে দারুণভাবে সহায়তা করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশেও যদি ফৌজদারি অপরাধের দণ্ড নিরূপণে এ ধরনের আধুনিক আইন প্রণয়ন করা যায়, তবে তা বিচারিক সিদ্ধান্তে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে এবং বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন আইন কমিশনের সচিব সৈয়দ আজাদ সুবহানী। পরে আলোচনা পর্বে অংশ নিয়ে প্রস্তাবিত আইনের ওপর গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী মতামত প্রদান করেন আইন কমিশনের সদস্য বিচারপতি শামীম হাসনাইন ও অধ্যাপক ড. নাইমা হক, আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব ড. হাফিজ আহমেদ চৌধুরীসহ অন্যান্য উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা।
জাতীয় এই সেমিনারে আইন ও বিচার বিভাগ, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ, আইন কমিশন, বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশন-সহ দেশের বিচারিক ব্যবস্থার সাথে যুক্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধি ও আইন বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।



