বাংলাদেশের ৩৪ টুথপেস্টের ২৬টিতে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক

বাংলাদেশের মানুষের ব্যবহার করা এসব টুথপেস্টের প্রতি ১০০ গ্রামে সর্বনিম্ন ২০টি করে সর্বোচ্চ ৩২০টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে পরীক্ষায়।

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে ব্যবহৃত টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে
বাংলাদেশে ব্যবহৃত টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে |প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশে বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩৪টি টুথপেস্ট, এর মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা প্লাস্টিকের অতি সুক্ষ্ম কণা। বাংলাদেশের মানুষের ব্যবহার করা এসব টুথপেস্টের প্রতি ১০০ গ্রামে সর্বনিম্ন ২০টি করে সর্বোচ্চ ৩২০টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে পরীক্ষায়। কোন কোন টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে সেগুলোর একটি তালিকাও দেয়া হয়েছে।

পরীক্ষাটি করেছে ‘এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন-এসডো’ নামক একটি পরিবেশ বিষয়ক গবেষণা সংস্থা। রোববার (২৬ জুলাই) তাদের গবেষণা প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিক প্রকাশ করেছে।

এসডোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে মেডিপ্লাস ফ্লোরাইড জেল টুথপেস্টে। এই পেস্টের ১০০ গ্রামের মধ্যে ৩২০টি কণা পাওয়া গেছে। এরপর রয়েছে ক্লোজআপ রেডহট (১৬০), ক্লোজআপ মেন্থল ফ্রেশ (১৬০টি), শিশুদের জন্য তৈরি কুডুম আল্ট্রাশিল্ড ফর্মুলা-স্ট্রবেরিতে ১৪০টি, সিগন্যাল গ্রিনটিতে ১২০টি, পেপসোডেন্ট অ্যাডভান্স সল্টে ১০০টি, হিমালয় কমপ্লিট কেয়ারে আছে ১০০টি, সেনসোডাইন ফ্রেশমিন্টে ৮০টি, পেপসোডেন্ট সেনসিটিভ এক্সপার্টে ৬০টি, হোয়াইট প্লাস রেডে ৬০টি, হোয়াইট প্লাস প্রো সেনসিটিভ জেলে ৬০টি, মেরিল বেবি-স্ট্রবেরিতে ৬০টি, সিগন্যাল হোয়াইটেনিং: ৬০টি, মেডিপ্লাস টিজিপি ফর্মুলায় ৬০টি, এএমপিএম হার্বালে ৪০টি, মেডিপ্লাস ডিএসে ৪০টি, পেপসোডেন্ট জার্মিচেক প্লাসে ৪০টি, মেরিল বেবি-অরেঞ্জে ৪০টি, ম্যাজিক হার্বালে ৪০টি, মেসবাক: ৪০টি, ক্লোজআপ মেন্থল ফ্রেশ স্যাশে ৪০টি, ডেন্টিন জেল টুথপেস্টে ২০টি, পেপসোডেন্ট কিডস-অরেঞ্জে ২০টি, ক্লোজ আপ লেমন সি সল্টে ২০টি, ব্রাশ আপ হোয়াইটেনিং জেলে ২০টি ও হোয়াইট প্লাস প্রো সেনসিটিভে ২০টি কণা পাওয়া গেছে।

এসডোর গবেষণায় যে ৩৪টি টুথপেস্ট পরীক্ষা করা হয়েছে এর মধ্যে বাংলাদেশে উৎপাদন হয় এমন ২৫টি টুথপেস্টের ২২টি, ভিয়েতনাম থেকে আসা ২টি টুথপেস্টের ২টিতেই, থাইল্যান্ডের ২টি টুথপেস্টের একটিতে, ভারতের ৫টি টুথপেস্টের একটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পেয়েছে। শিশুদের জন্য ৬টি টুথপেস্টের ৪টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। ৩৪টি পরীক্ষা করা টুথপেস্টের মধ্যে ৮টিতে কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে দেশীয় ব্র্যান্ডের জেনফ্রেশ, ক্লোজআপ রেডহট জিঙ্ক ফ্রেশ টেকনোলজি রয়েছে।

এসডো ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ‘এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি ল্যাবরেটরি’ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাটি যৌথভাবে পরিচালনা করে। বাংলাদেশে টুথপেস্ট তৈরিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহারের সর্বোচ্চ সীমার কোনো জাতীয় মানদণ্ড বা পরীক্ষাগার প্রটোকল নেই। কোম্পানিগুলো কি পরিমাণে প্লাস্টিক কণা উপাদান হিসেবে ব্যবহার করছে তা প্রকাশও করে না।

সরকার যেন এ বিষয়ে কঠোর আইন ও তদারকির ব্যবস্থা করে সেই তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করাও ছিল এই পরীক্ষার কারণ বলেন জানান এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকা সুলতানা। এ বিষয়ে একটি বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও বেসলাইন তৈরি করাও একটি উদ্দেশ্য।

এসডো তাদের গবেষণায় বলেছে, টুথপেস্ট ব্যবহারের পর নদী, পানির বাস্তুসংস্থান ও মাটিতে পড়ে থাকে। নদীর পানি ও মাছের মধ্যে প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি মিলেছে।

তারা জানিয়েছে, এসডো এক বছর ধরে ২ হাজার ৭৬০ জন ভোক্তার ওপর জরিপ ও ল্যাবটেস্টের মাধ্যমে এই পরীক্ষাটি চালিয়েছে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করলে কোষের ডিএনও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। এর তা থেকে ক্যান্সার বেড়ে যাওয়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে বলে অ্যামেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে।

পাবমেডের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্লাস্টিক অতিক্ষুদ্র কণা রাসায়নিক পদার্থের বাহক হিসেবে কাজ করে মানবস্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাবকে আরো বাড়িয়ে তোলে। দেহের বিভিন্ন টিস্যুতে এসব কণা জমা হয়ে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করে দীর্ঘস্থায়ী রোগ, প্রজনন সমস্যা এবং ভ্রুণ ও শিশু বিকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।