ওষুধের দাম নিয়ে ৩২ বছরের পুরোনো নীতিতে ফেরার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশে এমনিতেই চলছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, তার সাথে যুক্ত হয়েছে উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের কাছে চিকিৎসা ব্যয় অনেকটা ভীতির কারণ হয়ে উঠেছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন

Location :

Dhaka
অত্যাবশ্যকীয় তালিকায় থাকা ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেয় সরকার
অত্যাবশ্যকীয় তালিকায় থাকা ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেয় সরকার |সংগৃহীত

ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মাজহারুল ইসলাম বলছিলেন, ‘মায়ের ডায়াবেটিস-আর্থ্রাইটিস, বাবার হার্টে সমস্যাসহ আরো রোগ— নিয়মিত ডাক্তার দেখানো, ওষুধ কেনা, টেস্ট করা - এর মধ্যেই আছি। মাসে অন্তত ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়, মাঝেমধ্যে আরো বেশি।

পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা ব্যয় মিটিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন অনেকটাই কষ্টসাধ্য তার জন্য। তিনি বলেন, ‘আমার দু’টি ছোট বাচ্চা আছে, ওদের পেছনেও খরচ বাড়ছে- নিয়মিত সংসার খরচ তো রয়েছেই।’

বাংলাদেশে এমনিতেই চলছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, তার সাথে যুক্ত হয়েছে উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের কাছে চিকিৎসা ব্যয় অনেকটা ভীতির কারণ হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে চলতি মাসেই মন্ত্রিসভা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে তৈরি করা ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ২০২৬’ বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়।

এবং আইনি প্রক্রিয়া না মেনে জাতীয় ড্রাগ অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলের পরামর্শ ছাড়াই তালিকাটি তৈরি করায় এবং এ নিয়ে হাইকোর্টে রিট থাকায় সরকার তিন দশক আগের ১৯৯৪ সালের নীতিতে ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে জানা যাচ্ছে, ১৯৯৪ সালের নীতিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় ওষুধের সংখ্যা ছিল ১১৭টি, যা ২০১৬ সালের নীতিতে বাড়িয়ে করা হয়েছিল ২৮৫টি। সবশেষ ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংখ্যা বাড়িয়ে করা হয় ২৯৫টি।

এখন ২০১৬ এবং ২০২৫ সালের তালিকা বাতিল করে ১৯৯৪ সালের নীতিতে ফেরায় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংখ্যা কমে যাওয়ায় তা সাধারণ মানুষের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

কারণ এ সিদ্ধান্তের ফলে একদিকে যেমন অত্যাবশ্যকীয় তালিকা থেকে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ওষুধের নাম বাদ পড়ছে, তেমনি ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের কর্তৃত্বও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

BBcc

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি রোগীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। নতুন নিয়ম পর্যালোচনার বদলে তিন দশকেরও বেশি সময় আগের নীতিতে ফেরার সিদ্ধান্ত ‘অযৌক্তিক’ বলেই মত তাদের।

যদিও, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের নতুন তালিকা তৈরি এবং মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে আগের সরকার আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়নি বলেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে দাবি বর্তমান সরকারের।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা তথ্য বলছে, দেশের দরিদ্রতম পরিবারগুলো তাদের আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করে।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয়ের বড়ো অংশই রোগীদের নিজস্ব অর্থে বহন করতে হয় বলে সংসদে জানিয়েছিলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা: এম এ মুহিত। তার দেয়া তথ্য অনুসারে, দেশে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ রোগীদের পকেট থেকেই বহন করতে হয়, যেখানে থাইল্যান্ডে এ হার ১০ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ১৮ শতাংশ।

প্রশ্ন উঠছে কেন?
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হলো এমন কিছু জীবনরক্ষাকারী ও গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের নির্দেশিকা, যা একটি দেশের সাধারণ মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা ও রোগ নিরাময়ের প্রধান চাহিদাগুলো পূরণ করে।

এ তালিকায় সাধারণত ব্যথা ও জ্বরনাশক, অ্যান্টিবায়োটিক ও সংক্রমণরোধী, হৃদরোগ ও রক্তচাপ, পেটের পীড়া, মৃগী ও স্নায়ুরোগ, অ্যানেস্থেসিয়া ও অস্ত্রোপচারসহ নানা ধরণের ওষুধ থাকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি অনুযায়ী এসব ওষুধ সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী দামে নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৭৭ সাল থেকেই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বা মডেল এসেনশিয়াল মেডিসিন লিস্ট প্রতি দুই বছর পর পর হালনাগাদ করছে।

বাংলাদেশেও অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের একটি তালিকা রয়েছে।

বর্তমান সরকার আইনি জটিলতার বিষয়টি সামনে এনে সবশেষ সিদ্ধান্ত বাতিল করে ১৯৯৪ সালের আদেশে থাকা অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং ওষুধের সরকারি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা বহাল করেছে।

আর এ সিদ্ধান্ত অবাক করেছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। তারা বলছেন, ২০২৬ সালের সিদ্ধান্ত যদি আইনি জটিলতা থেকেও থাকে, তাহলে তার আগেরটা আমলে নেয়া যেত।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা: মুশতাক হোসেন বলেন, ‘ওষুধের তালিকা আরো বাড়ানোর দাবি ছিল। যেটুকু বাড়ানো হয়েছিল সেখান থেকেও একেবারে ১৯৯৪ সালের নিয়মে চলে যাওয়া অবাস্তব।’

তিনি বলেন, ‘১৯৯৪ সালের অনেক ওষুধ এখন আর ব্যবহৃত হয় না, অনেকগুলো ওষুধ অকার্যকর হয়ে গেছে, অনেক ওষুধের প্রযুক্তিগত উন্নতির কারণে খরচ কমেছে। সরকার চাইলে এগুলো পুরোপুরি বাতিল না করে প্রয়োজনে তালিকা এবং মূল্য নীতি সংশোধন করতে পারত।’

সরকারের এ সিদ্ধান্ত জনস্বাস্থ্য বিবেচনার চেয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে কী-না সে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ১৯৮২ সালের ওষুধ নীতির ফলেই বাংলাদেশে ওষুধ শিল্প একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছে। তাদের উৎপাদন, বাণিজ্য, রফতানি বেড়েছে। কিন্তু তারা যদি জনস্বাস্থ্যের বিষয়ে সহযোগিতা না করে, তাহলে ফার্মা কোম্পানির বিরুদ্ধেও ভবিষ্যতে যে-কোনো সিদ্ধান্ত নিতে সরকার উৎসাহ পাবে।

ডা: হোসেন মনে করিয়ে দেন, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার মূল লক্ষ্য ছিল চিকিৎসা ব্যয় কমানো। কিন্তু নতুন পদক্ষেপের মাধ্যমে চিকিৎসা ব্যয় কমার বদলে আরো বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হলো কী-না সে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

Bb

কী বলছে সরকার?
গত ৩ অগাস্ট সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ২০২৬ সালের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিলের প্রস্তাব অনুমোদন হয়। যার কারণ হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে কয়েকটি যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।

সরকার বলছে, ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়নের আগে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ নেয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তালিকা প্রকাশের সময় সে পরামর্শ নেয়নি।

নতুন যে তালিকা অন্তর্বর্তী সরকার প্রণয়ন করেছে, সেটি নিয়ে আইনি জটিলতাও রয়েছে। কারণ, এই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে প্রথমে বাংলাদেশ ইউনানি মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন এবং পরে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি হাইকোর্টে রিট করে।

সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তারা নিরাপদ, কার্যকর এবং সাশ্রয়ী মূল্যের ওষুধ জনগণের জন্য নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করার কথাও জানানো হয়েছে।

এছাড়া ওষুধের মূল্য এমনভাবে নির্ধারণ করা হবে, যেন জনগণের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি না হয় এবং বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় রাখার কথাও বলছে সরকার। তবে, আইনি প্রক্রিয়া না মানার যে যুক্তি সরকার দিচ্ছে তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা: মুশতাক হোসেন।

তিনি বলেন, ‘উপদেষ্টা কমিটির পরামর্শ নেয়া হয়নি বলে আগের সরকারের তালিকা বাতিল করা হলো। এখন ক্যাবিনেটের সিদ্ধান্ত দিয়ে সেটি করা হলো। অর্থাৎ এ সরকারও আলোচনা করলো না।’

এছাড়া ওষুধ উপদেষ্টা কমিটিতে ভোক্তাদের কোনো অংশগ্রহণ না থাকা নিয়েও সমালোচনা করেছেন তিনি।

সবশেষ নীতিতে যা ছিল
২০২৫ সালের ২৪শে জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের জাতীয় তালিকা প্রণয়ন ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে ১৮ সদস্যের একটি টাস্কফোর্স গঠন করে। পরে ওষুধের মূল্য নির্ধারণে আট সদস্যের একটি উপকমিটিও করা হয়।

টাস্কফোর্স ও কমিটি ওষুধ বিশেষজ্ঞ, ওষুধশিল্প মালিক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন পক্ষের সাথে পৃথক সভা করে সুপারিশ নিয়ে তালিকা ও নীতি চূড়ান্ত করে।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমান তখন জানিয়েছিলেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় নতুন ওষুধ যুক্ত করে ২৯৫টি করা হয়েছে, যে ওষুধগুলোর দাম নির্ধারণ করবে সরকার।

ওই সময় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে, দেশের মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয়ের দুই-তৃতীয়াংশ যায় ওষুধের পেছনে। ওষুধের মূল্য যেন প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, মানুষের কাঁধ থেকে ব্যয়ের বোঝা কমানোর জন্যই এ উদ্যোগ।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী সেসময় দাবি করেছিলেন, সবকিছু আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রীতিনীতি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মেনেই করা হয়েছে।

২০২৬ সালের ওই নীতিতে মূল্য সমন্বয়ের ব্যাপারে কোম্পানিগুলোকে চার বছর সময় দেয়ার কথাও বলা হয়েছিল। যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মূল্য নির্ধারণ কাঠামো কখনোই মেনে নেয়নি ফার্মাসিউটিক্যাল ব্যবসায়ীরা।

সে সময় সরকারের বিরুদ্ধে একতরফা সিদ্ধান্ত নেয়ার অভিযোগ তুলেছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ।

সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সরকার যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি এমন অভিযোগ তুলে আদালতে একাধিক রিটও হয়েছিল।

সূত্র : বিবিসি