স্বাস্থ্যমন্ত্রী

ডেঙ্গু পরিস্থিতি গত বছরের তুলনায় অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকার, স্থানীয় প্রশাসন এবং জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরো কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

সংসদ প্রতিবেদক
প্রতীকী ছবি

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, চলতি বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় সরকার সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।

বুধবার (১৫ জুলাই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোঃ নূরুল ইসলাম বুলবুলের ৭১ বিধিতে করা জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ কথা বলেন।

সংসদ সদস্য মোঃ নূরুল ইসলাম বুলবুল দেশব্যাপী ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ এবং সমন্বিত মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার সাথে সাথে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরু থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত দেশে প্রায় ৬,১৭৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু গত ৮ জুলাই ২৪ ঘণ্টায় ১৯৬ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার অনুকূল পরিবেশ, অপর্যাপ্ত মশক নিধন কার্যক্রম এবং জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার বৃদ্ধির কারণে আগামী কয়েক সপ্তাহে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরো অবনতি ঘটতে পারে। আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষণেও জুলাই ও আগস্ট মাসে আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ডেঙ্গু বর্তমানে শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়; দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। অনেক সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোথাও কোথাও শয্যা, পরীক্ষার সুবিধা, প্লাটিলেট ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষিত জনবল ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থায়, জনস্বার্থে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীর বক্তব্য ও সরকারের করণীয় জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা একান্ত প্রয়োজন।

১. দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের বর্তমান প্রস্তুতি ও কর্মপরিকল্পনা; ২. সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সমন্বিত মশক নিধন কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ; ৩. সরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যা, আইসিইউ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ এবং চিকিৎসক-নার্সের পর্যাপ্ততা নিশ্চিতকরণ; ৪. জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা; ৫. জনসচেতনতা বৃদ্ধি, এডিস মশার প্রজননস্থল গাংস এবং নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম আরো শক্তিশালী করার পদক্ষেপ।

জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৮ হাজার ৯৭৮ জন এবং মারা গেছেন ২৮ জন। একই সময়ে ২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৫ হাজার ২০০ এবং মৃত্যু হয়েছিল ৫৮ জনের। অর্থাৎ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

তিনি বলেন, এই পরিসংখ্যানের জন্য আত্মপ্রশংসা করতে চাই না। কারণ, একজন মানুষের মৃত্যুও আমাদের জন্য বেদনাদায়ক। তবে সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের ফলে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

মন্ত্রী জানান, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি বিভাগীয় পরিচালক, সিভিল সার্জন, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাসহ স্থানীয় প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করছে। সারা দেশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা, ড্রেন পরিষ্কার এবং মশকনিধন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ দেশের সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় নিয়মিত এ কার্যক্রম চলছে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। অনেক সময় স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়িতে গিয়ে সম্ভাব্য এডিস মশার প্রজননস্থল পরিদর্শনের সুযোগ পান না। তাই বাসাবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং কোথাও পানি জমতে না দেয়া সবার দায়িত্ব। পাশাপাশি পূর্ণহাতা পোশাক ব্যবহার ও মশারি টাঙিয়ে ঘুমানোরও পরামর্শ দেন তিনি।

চিকিৎসা প্রস্তুতির বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য এনএস১ পরীক্ষা বিনামূল্যে করা হচ্ছে। এ ছাড়া আরটি-পিসিআর পরীক্ষার ফি ৩০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি আরো জানান, বর্তমানে কেন্দ্রীয়ভাবে ১ লাখ ৬ হাজার ৬০০টি আরডিটি (র‌্যাপিড ডায়াগনস্টিক টেস্ট) কিট মজুদ রয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে আরো প্রায় ৫ লাখ কিট সংগ্রহ করা হবে। একই সাথে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় স্যালাইন, ওষুধ ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম পর্যাপ্ত পরিমাণে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং সেগুলো উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সরবরাহ করা হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতি অবনতি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে মেডিক্যাল টিম, ভেন্টিলেটর, আইসিইউ ও জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল টিমও সহায়তায় প্রস্তুত রয়েছে। এ ছাড়া রোগী স্থানান্তরের জন্য সারাদেশে সমন্বিত রেফারেল ব্যবস্থাও চালু রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রতিদিন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে, যাতে দেশের কোথাও ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকার, স্থানীয় প্রশাসন এবং জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরো কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।