ইউনিভার্সিটি অব মালায়ার দুই বাংলাদেশী এবং এক মালয়েশিয়ান সাবেক শিক্ষার্থী মিলে মালয়েশিয়ায় এআইভিত্তিক কৃষি সরবরাহব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) স্টার্টআপ ‘ফ্রেশ মুভ’ চালু করেছেন। স্টার্টআপটির লক্ষ্য- স্থানীয় কৃষক ও নির্ভরযোগ্য আমদানিকারকদের সরাসরি মুদি দোকান, হোটেল ও রেস্তোরাঁর সাথে যুক্ত করে কৃষিপণ্য বিপণনকে আরো কার্যকর করা, সরবরাহব্যবস্থার অদক্ষতা কমানো এবং খাদ্য অপচয় হ্রাসে ভূমিকা রাখা।
প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা হলেন মো: ফরহাদ হোসেন, মো: শাহীন আলম ও নূর শাফিকাহ বিনতি রোসলান। তিনজনই ইউনিভার্সিটি অব মালায়ার সাবেক শিক্ষার্থী। এর মধ্যে মো: ফরহাদ হোসেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), মো: শাহীন আলম প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও) এবং নূর শাফিকাহ বিনতি রোসলান প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ফ্রেশ মুভের ধারণার সূচনা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একটি শিক্ষাসফরে। সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মো: ফরহাদ হোসেন ক্যামেরন হাইল্যান্ডসে গিয়ে দেখেন, উন্নতমানের শাকসবজি ও ফলমূল উৎপাদিত হলেও বাজারে পৌঁছানোর সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক কৃষক কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছেন না। বাজারে প্রবেশের সুযোগের অভাব, দুর্বল প্যাকেজিং এবং অনির্ভরযোগ্য পরিবহনব্যবস্থার কারণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিপণ্য বিক্রি না হয়েই থেকে যায়। অথচ কৃষি উৎপাদনের জন্য মালয়েশিয়ার উর্বর ভূমি ও অনুকূল আবহাওয়া বড় সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।

এই অভিজ্ঞতার পর মালয়েশিয়ার কৃষি খাতের সম্ভাবনা আরো গভীরভাবে যাচাই করার উদ্যোগ নেন ফরহাদ। তিনি বাংলাদেশ থেকে একজন অভিজ্ঞ কৃষককে এনে সেলাঙ্গরের পুচং এলাকায় এমন কিছু ফসলের পরীক্ষামূলক চাষ করান, যেগুলো দেশটিতে সাধারণত উৎপাদিত হয় না। প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষায় সব ফসলই সফলভাবে উৎপাদিত হয় এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে সেগুলোর মান বাজারে বিক্রি হওয়া আমদানিকৃত পণ্যের চেয়েও ভালো ছিল।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই প্রতিষ্ঠাতারা উপলব্ধি করেন, মালয়েশিয়ায় কৃষি উৎপাদনের সম্ভাবনার চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কৃষক ও ক্রেতার মধ্যে কার্যকর সংযোগের অভাব। ফলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থাকে আরো দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলাই হতে পারে সমস্যার অন্যতম সমাধান। সেই ভাবনা থেকেই যাত্রা শুরু করে ফ্রেশ মুভ।

মো: ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা দেখেছি, উন্নতমানের ফসল উৎপাদন করেও অনেক কৃষক সঠিক বাজারে পৌঁছাতে পারছেন না। সমস্যাটি কখনোই শুধু উৎপাদন ছিল না, বরং খামার থেকে ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থার অভাব ছিল। সেই ব্যবধান কমাতেই আমরা এই প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছি।’
প্রতিষ্ঠানটির এআইভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম কৃষিপণ্যের চাহিদা ও সরবরাহের তথ্য রিয়েল টাইমে বিশ্লেষণ করে কৃষক, আমদানিকারক এবং বাণিজ্যিক ক্রেতাদের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে। এর মাধ্যমে মুদি দোকান, হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলো তাদের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত কৃষিপণ্য সংগ্রহ করতে পারে। একইসাথে কৃষকদের উৎপাদনের মান উন্নয়ন, প্যাকেজিং এবং বাণিজ্যিক মানদণ্ড অনুসরণে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তাও দেয়া হয়।
এআইভিত্তিক চাহিদা বিশ্লেষণের পাশাপাশি ফ্রেশ মুভ নিজস্ব লজিস্টিক নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, স্মার্ট রুটিং ও চাহিদা পূর্বাভাস প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষিপণ্য দ্রুত খামার থেকে ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। এতে সরবরাহে বিলম্ব ও পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমে এবং প্রচলিত সরবরাহব্যবস্থার একাধিক ধাপ এড়িয়ে কৃষিপণ্য আরো দ্রুত বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হয়।
স্টার্টআপটি কন্ট্রাক্ট ফার্মিং কর্মসূচিও পরিচালনা করছে। এই কর্মসূচির আওতায় কৃষকদের জন্য জমির ব্যবস্থা করা হয় এবং মানসম্মত উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) অনুসরণে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। কৃষকেরা মূলত উৎপাদনে মনোযোগ দেন, আর বাজারজাতকরণ, পরিবহন, সরবরাহ এবং বিক্রির দায়িত্ব পালন করে ফ্রেশ মুভ।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, দীর্ঘমেয়াদে তাদের লক্ষ্য মালয়েশিয়ায় দেশীয় খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং স্থানীয় কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা। প্রযুক্তিনির্ভর সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে কৃষিপণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে আরো দক্ষ, স্বচ্ছ ও টেকসই করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।



