বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ হাইস্কুল পদার্থবিজ্ঞান প্রতিযোগিতা বিমলাইন ফর স্কুলস (BL4S)-এ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশের ‘টিম পোলারিস’। প্রতিযোগিতার ১৩ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো বাংলাদেশি দল এ সাফল্য অর্জন করল।
মঙ্গলবার (২ জুন) ইউরোপীয় পারমাণবিক গবেষণা সংস্থা সার্ন (CERN) তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিজয়ী দলগুলোর নাম ঘোষণা করে।
২০১৪ সালে সার্নের উদ্যোগে শুরু হওয়া এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এ বছর বিশ্বের ৮৯টি দেশ থেকে ৭১২টি গবেষণা প্রস্তাব জমা পড়ে। সেখান থেকে নির্বাচিত বৈশ্বিক বিজয়ী পাঁচটি দলের মধ্যে স্থান করে নেয় বাংলাদেশের টিম পোলারিস।
এ বছরের বিজয়ী অন্য দলগুলো হলো ভারতের Team attoPION, তুরস্কের Team PionIST 3, যুক্তরাজ্যের Team Mobile MIPs এবং যুক্তরাষ্ট্রের Team Centauri Stars। বিজয়ী দলগুলো তাদের প্রস্তাবিত গবেষণা বাস্তবায়নের জন্য সার্ন এবং জার্মানির আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কেন্দ্র DESY ও ELSA-তে কাজ করার সুযোগ পাবে।
একই সাথে বাংলাদেশের আরেকটি দল ‘টিম জিওমেট্রি’ বিশ্বের সেরা ৫০টি শর্টলিস্টেড দলের তালিকায় স্থান পেয়েছে। একই কোচ ও শিক্ষার্থী-নেটওয়ার্ক থেকে দুটি ভিন্ন গবেষণা দল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পাওয়াকে বিরল অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
টিম পোলারিসের সদস্যরা হলেন নোয়াখালীর চৌমুহনী সরকারি সালেহ আহমদ কলেজের শিক্ষার্থী সালমান আলম সোহান, মো. আব্দুল রহিম পরশ ও এস এম তাওসিফ, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের নাজিফা তাসনিম এবং রংপুর কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নাজিয়া তিতিম। দলটির কোচ ছিলেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো: নিশাদ আহমেদ জীবন।
টিম পোলারিসের বিজয়ের পেছনে রয়েছে ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত রেডিয়েশন থেরাপির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নিয়ে গবেষণা প্রস্তাব। বর্তমানে রেডিয়েশন থেরাপিতে ব্যবহৃত স্কিন্টিলেটর রোগীর শরীরে কতটুকু বিকিরণ পৌঁছাচ্ছে তা পরিমাপ করতে সাহায্য করে। তবে প্রচলিত প্লাস্টিক স্কিন্টিলেটর দীর্ঘ সময় উচ্চমাত্রার বিকিরণের সংস্পর্শে থাকলে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে চিকিৎসার ব্যয় বেড়ে যায়।
এর বিকল্প হিসেবে দলটি পলিসাইলক্সেন নামের একটি উপাদান ব্যবহারের প্রস্তাব দেয়। এটি প্রচলিত প্লাস্টিকের তুলনায় বেশি টেকসই এবং উচ্চমাত্রার বিকিরণ সহ্য করতে সক্ষম। বিচারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই উদ্ভাবনী গবেষণা ধারণাই। গবেষণাটি সফল হলে ক্যানসার চিকিৎসা থেকে শুরু করে মহাকাশ গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
দলের কোচ নিশাদ আহমেদ জীবন বলেন, ‘আমরা শুরুতে এত বড় সাফল্যের কথা ভাবিনি। গবেষণাটি সফল হলে রেডিওথেরাপির ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে কমানো সম্ভব হতে পারে। বাংলাদেশকে এ পর্যায়ে তুলে ধরতে পেরে আমরা গর্বিত। ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আরও বড় অর্জন সম্ভব।’
দলের সদস্য সালমান আলম সোহান বলেন, ‘ছয় মাস আগে শুধু একটি প্রস্তাব জমা দেওয়ার ইচ্ছা ছিল। তখন দলও গঠন করা হয়নি। খুব অল্প সময়ে দুটি প্রস্তাব জমা দিয়েছিলাম। এমন সাফল্য আশা করিনি। BL4S-এর বিজয়ীদের তালিকায় বাংলাদেশের নাম দেখতে পাওয়া সত্যিই অবিশ্বাস্য অনুভূতি।’
বিজয়ী দল হিসেবে টিম পোলারিস আগামী আগস্টে জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব বনের ELSA (Electron Stretcher Accelerator) পার্টিকেল অ্যাক্সিলারেটরে সরাসরি তাদের গবেষণা পরিচালনার সুযোগ পাবে। এই গবেষণা কেন্দ্রটি ক্যানসার চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট গবেষণা এবং ডিটেক্টর ফিজিক্সে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এ ছাড়া দলটি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম কণা পদার্থবিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান CERN (সার্ন) পরিদর্শনের সুযোগও পাবে, যেখানে একসময় আবিষ্কৃত হয়েছিল বহুল আলোচিত হিগস বোসন কণা। বিশ্বসেরা বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ ও শেখার এই সুযোগ বাংলাদেশের তরুণ গবেষকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
টিম পোলারিসের এই অর্জন আবারো প্রমাণ করল, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিযোগিতা করার মতো মেধা ও সক্ষমতা বাংলাদেশের তরুণদের রয়েছে। প্রয়োজন শুধু উপযুক্ত সুযোগ ও সহায়তা।



