ইবি সংবাদদাতা
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি (আইসিটি) বিভাগের প্রভাষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
সোমবার (২৯ জুন) বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকার্টের ২৭৪তম (সাধারণ) সভায় ‘নোট অব ডিসেন্ট’ সত্ত্বেও আইসিটি বিভাগের বিএনপিপন্থী শিক্ষক নেতার স্ত্রী ফিরোজা নাজনীনকে ওই বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত হওয়ায় এ বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা অনিয়মের অভিযোগ দৃষ্টিগোচর হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার নিয়োগপত্র প্রদান স্থগিত রেখেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে গত ১৪ মে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫তম ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) হিসেবে দায়িত্ব নেন লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান। দায়িত্ব নিয়েই শিক্ষক সংকট নিরসনে নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করেন তিনি।
এ সময় তিনি অতীতের নানা বিতর্ক থেকে বেরিয়ে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার প্রত্যাশার কথাও জানান। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি বিভাগে চারজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে নতুন প্রশাসনের প্রথম নিয়োগেই আইসিটি বিভাগের প্রভাষক নিয়োগকে ঘিরে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগে আবারো নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে অভিযোগগুলো ব্যক্তিগতভাবে যাচাই করে দেখার কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান।
জানা যায়, প্রার্থী ফিরোজা নাজনীন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি বিভাগের ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তবে তিনি প্রথম বর্ষের ‘ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিজম’ কোর্সে অকৃতকার্য হয়ে রিটেক এবং দুটি কোর্সে মানোন্নয়ন দিয়ে ৩.৩৮ সিজিপিএ নিয়ে উত্তীর্ণ হন। পরে দ্বিতীয় বর্ষের একটি কোর্সে মানোন্নয়নসহ ৩.৪২ সিজিপিএ এবং তৃতীয় বর্ষের একটি কোর্সেও মানোন্নয়নসহ ৩.৬৪ সিজিপিএ নিয়ে উত্তীর্ণ হন। তবে মানোন্নয়ন ছাড়া তার অনার্সের সিজিপিএ ছিল ৩.৪২। মানোন্নয়ন ও রিটেকসহ অনার্সে তার সিজিপিএ হয় ৩.৫৯।
আরো জানা যায়, অন্যান্য প্রার্থীদের তুলনায় একাডেমিক রেজাল্টেও অনেক পিছিয়ে রয়েছেন ফিরোজা নাজনীন। মাস্টার্সে তিনি নন-থিসিস গ্রুপের ছাত্রী ছিলেন। অথচ আরেক প্রার্থী মো. রাকিবুল ইসলাম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। অনার্সে তার সিজিপিএ ৩.৯৫ এবং থিসিসসহ মাস্টার্সে ৩.৮৮। এছাড়া অপর প্রার্থী চাঁদপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু রুম্মান রিফাত অনার্সে ৩.৭৮ এবং থিসিসসহ মাস্টার্সে ৩.৯১ সিজিপিএ অর্জন করলেও তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
এদিকে ফিরোজার স্বামী ড. জাহিদুল ইসলাম একই বিভাগের অধ্যাপক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষক সংগঠন জিয়া পরিষদের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক। শিক্ষকের স্ত্রী হওয়ায় নানা অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। জানা যায়, ফিরোজা শিক্ষার্থী থাকাকালে দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই বিভাগের শিক্ষক ড. জাহিদুল ইসলামের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে তিনি তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত অবস্থায় তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এছাড়া ফিরোজা তৃতীয় ও quarto বর্ষে থাকাকালে ড. জাহিদুল ইসলাম দুই দফায় পরীক্ষা কমিটির সভাপতি ছিলেন। এ সময় অ্যাকাডেমিক অনিয়মের মাধ্যমে তার ফলাফল প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের তুলনায় বৃদ্ধি করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ড. জাহিদুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘আমি ২০০৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বিদেশে পিএইচডি প্রোগ্রামে ছিলাম। আমাদের বিয়ে হয়েছে ২০১৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। সে যখন ছাত্রী ছিল, তখন আমি একজন ফ্যাকাল্টি সদস্য হিসেবে একটি কমিটিতে ছিলাম। কিন্তু আমাদের বিয়ের সময় আমি কোনো কমিটিতে ছিলাম না, এমনকি ফিরোজার কোনো ক্লাসও নিইনি।’
পরীক্ষা কমিটির সভাপতি থাকাকালে স্ত্রীর অ্যাকাডেমিক ফলাফলে অস্বাভাবিক পরিবর্তনের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ ভুয়া ও ভিত্তিহীন। আমি একজন শিক্ষক মাত্র। একটি কমিটিতে আরো চারজন সদস্য থাকেন। একজন শিক্ষক কি সব কোর্স পড়ান? সব বিষয়ে নম্বর দেন? বরং আমার সাথে বিয়ে হয়েছে বলে তাকে থিসিস দেওয়া হয়নি। এটা সম্পূর্ণ অন্যায্য ছিল। মাস্টার্সের বিভিন্ন পরীক্ষাতেও সে কম নম্বর পেয়েছে।’
এদিকে নিয়োগ বোর্ডের আগের দিন (২৮ জুন) বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী ফারহান আহমেদের সঙ্গে অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলাম দেখা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তারা কুষ্টিয়ার দিশা টাওয়ারে সাক্ষাৎ করেন। একই স্থানে আইসিটি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. তারেক হাসান আল মাহমুদও গিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনাকে নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতার জন্য প্রশ্নবিদ্ধ উল্লেখ করে অন্য প্রার্থীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
নিয়োগ ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টা আমি দেখছি। নিয়োগ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আমরা প্রার্থীদের পারফরম্যান্স দেখেই যাচাই করেছি। অতীতের অ্যাকাডেমিক ফলাফলও দেখা হয়েছে। অভিযোগসহ সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’



