ববি’র হাসান মিয়া এখন পররাষ্ট্র ক্যাডারে, অনুজদের দিলেন সাফল্যের মূলমন্ত্র

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো: হাসান মিয়া। সদ্য ঘোষিত ৪৭তম বিসিএস-এর চূড়ান্ত ফলাফলে তিনি অন্যতম শীর্ষ ও মর্যাদাপূর্ণ ‘পররাষ্ট্র ক্যাডারে’ (IFS) সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।

মেহরাব হোসেন, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

Location :

Barishal
ববি’র হাসান মিয়া এখন পররাষ্ট্র ক্যাডারে, অনুজদের দিলেন সাফল্যের মূলমন্ত্র
ববি’র হাসান মিয়া এখন পররাষ্ট্র ক্যাডারে, অনুজদের দিলেন সাফল্যের মূলমন্ত্র |নয়া দিগন্ত

‘চাকরির ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বড় ফ্যাক্টর নয়; বরং নিজের প্রস্তুতি, জানার পরিধি আর ভাইভা বোর্ডে নিজের সেরাটা ফুটিয়ে তোলাই আসল কথা।’

কথাগুলো বলছিলেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো: হাসান মিয়া। সদ্য ঘোষিত ৪৭তম বিসিএস-এর চূড়ান্ত ফলাফলে তিনি অন্যতম শীর্ষ ও মর্যাদাপূর্ণ ‘পররাষ্ট্র ক্যাডারে’ (IFS) সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।

পিরোজপুরের সন্তান হাসান মিয়ার এই গৌরবোজ্জ্বল অর্জন শুধু তার নিজের নয়, বরং গোটা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এক বিরাট আনন্দের ও গৌরবের বার্তা বয়ে এনেছে।

এই অভাবনীয় সাফল্যের জন্য প্রথমেই মহান আল্লাহর দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া আদায় করেছেন হাসান।

তিনি বলেন, ‘আল্লাহর কাছে সবসময় চাইতাম, আমার জন্য যা উত্তম, তা-ই যেন আমাকে দান করেন।’

সাফল্যের এই মাহেন্দ্রক্ষণে তিনি কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করেন তার বাবা-মা, শিক্ষক-শিক্ষিকা, বন্ধু-বান্ধব এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের; যারা এই দীর্ঘ ও কঠিন যাত্রায় তাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা জুগিয়েছেন।

যেভাবে শুরু বিসিএস প্রস্তুতি:

হাসানের বিসিএস যাত্রার গল্পটা শুরু হয়েছিল মাস্টার্স ২য় সেমিস্টারের লিখিত পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর। এর আগে টুকটাক পড়াশোনা করলেও, পুরোদমে আগ্রহ নিয়ে মাঠে নামেন ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে। এরপরই আসে ৪৫তম বিসিএসের সার্কুলার। শুরু হয় দিনরাত এক করা প্রস্তুতি।

এরই মধ্যে তিনি ৪৬তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও পরবর্তী সময়ে ভাইভাতে আর অংশ নেননি।

এর মাঝেই ৪৭তম বিসিএসের প্রিলিমিনারিতে পাস করার পর তিনি বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (বিপিএটিসি) ‘গবেষণা কর্মকর্তা’ হিসেবে যোগদান করেন।

দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও একটি চমৎকার সিদ্ধান্ত: চাকরিতে যোগদানের মাত্র ৬ দিনের মাথায় ৪৭তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার জন্য ছুটি মঞ্জুর করেন বিপিএটিসির মাননীয় রেক্টর মহোদয়, যার প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন হাসান।

টুইস্টটা আসে ঠিক তখনই, যখন তিনি সাভার থেকে বরিশাল যাচ্ছিলেন লিখিত পরীক্ষা দিতে। পথিমধ্যেই প্রকাশিত হয় ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল এবং সেখানে তিনি ক্যাডার হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। এক ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই পরের পরীক্ষাগুলো দেয়া নিয়ে মনে দ্বিধা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সব ভাবনাকে পাশে ঠেলে তিনি ৪৭তম বিসিএসের সবগুলো পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সব দ্বিধা উপেক্ষা করে ভাইভা দেয়ার পর আজ তিনি বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারে দেশের সেবা করার অনন্য সুযোগ পেয়েছেন।

পররাষ্ট্র ক্যাডার ভালো লাগার মূল কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে দেশের মর্যাদা, আত্মসম্মান ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও বৃদ্ধিতে সরাসরি কাজ করার অপূর্ব সুযোগ রয়েছে।

সাফল্যের নেপথ্যে মূলমন্ত্র: হাসান মিয়ার মতে, তার এই সফলতার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করেছে— সবসময় নিজের জন্য যেটা সেরা, স্রষ্টার কাছে সেটাই প্রার্থনা করা; বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা মন দিয়ে করা (বিশেষ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ বিসিএসের জন্য ভীষণ সহায়ক বা ফ্রেন্ডলি হওয়ায় তিনি বাড়তি সুবিধা পেয়েছেন) এবং শিক্ষার্থীদের পড়ানোর মাধ্যমে নিজের বেসিক বা ভিতটা অনেক বেশি শক্ত হওয়া, যা পরীক্ষার টেবিলে দারুণ কাজে দিয়েছে।

চ্যালেঞ্জ জয় ও ববি’র সম্ভাবনা

চাকরি ও টিউশন সামলে বিসিএসের পড়াশোনা করাটা হাসানের জন্য বেশ বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। অনেক ভাইবা বোর্ডে গিয়ে তিনি দেখেছেন, প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে একমাত্র তিনিই বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করছেন। সেই প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়াটা তাকে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করত।

অনুজদের জন্য দিকনির্দেশনা

বিশ্ববিদ্যালয়ের জুনিয়র বা অনুজদের উদ্দেশ্যে হাসান মিয়া বলেন, সফল হতে গেলে ধৈর্য, কঠোর ও সঠিক পরিশ্রম, অধ্যবসায়, নিয়মানুবর্তিতা ও আত্মসংযমের বিকল্প কিছু নেই।

তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন— সবসময় ইতিবাচক চিন্তাভাবনা করা এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা। চাওয়া এবং প্রাপ্তির মধ্যে গ্যাপ যত কম, জীবনে হতাশা তত কম।

যেকোনো চাকরির প্রস্তুতির জন্য প্রতিদিন কম-বেশি পড়াশোনা করা, নিয়মিত পত্রিকা পড়া, নোট করা এবং বেসিক ও মৌলিক বইগুলো পড়া অত্যন্ত জরুরি। ভালো মার্কস পেতে সাবলীল, প্রাসঙ্গিক উপস্থাপনা এবং বোধগম্য হাতের লেখা প্রয়োজন।

এর জন্য ডেটা, চার্ট ও কোটেশনগুলো মুখস্থ করে ফেলা উচিত। সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং সময় মেনে সব প্রশ্নের উত্তর করার মানসিকতা জাগ্রত করতে হবে।