নদীকে ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে বলে মন্তব্য করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘নদী, জলাশয় ও পরিবেশ রক্ষায় সরকার নিয়মিতভাবে কাজ করছে। এসব উদ্যোগ শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পরিবেশ দূষণ কমাতে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করা হচ্ছে।’
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) ও নেক্সটইরা ফর এনভায়রনমেন্ট, ইক্যুইটি অ্যান্ড রাইটসের (এনইই্আর) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী পরিবেশবান্ধব কর্মসূচির সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘গত ১৫ দিনে পরিবেশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চার-পাঁচটি বৈঠকে অংশ নিয়েছি। এর মধ্যে ইটভাটা, শিল্প ও নদীদূষণ, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদীর দূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিক ও পলিথিন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা প্রতিনিয়ত এসব বিষয়ে কাজ করছি এবং দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছি।লোক দেখানোর জন্য বা শুধু আনুষ্ঠানিকতার জন্য নয়।’
কাঠ পোড়ানো ইটভাটা বন্ধের উদ্যোগ ইটভাটার দূষণ প্রসঙ্গে পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে এখনো কয়েকশ ইটভাটায় কাঠ পুড়িয়ে সনাতন পদ্ধতিতে ইট উৎপাদন করা হয়। চলতি মৌসুমের পর নতুন মৌসুমে এসব ইটভাটা আর চালাতে দেয়া হবে না।’
তিনি বলেন, ‘এটাকে আমরা প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখছি। কাঠ পোড়ানো বন্ধ করতে পারলে দূষণ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। পাশাপাশি অবৈধ ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধেও আমাদের কার্যক্রম চলছে।’
ছয় মাসে ২৩০০ একরের বেশি বনভূমি উদ্ধার বনভূমি দখল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ছয় মাসে দুই হাজার ৩০০ একরের বেশি জায়গা উদ্ধার করে সেখানে বনায়ন করা হয়েছে। কোথাও ২০০, কোথাও ৩০০ একর করে জায়গা উদ্ধার করা হয়েছে। এসবের তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। আমি মনে করি, দুই হাজার ৩০০ একরের বেশি জায়গা উদ্ধার করে সেখানে প্ল্যান্টেশন করা আমাদের একটি বড় সাফল্য।’
সুন্দরবনে এ বছর আগুন নিয়ন্ত্রণে সুন্দরবনের আগুন প্রসঙ্গে শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘গত ২২ বছরে সুন্দরবনে ২৭ বার আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে।’
তবে চলতি বছর বন বিভাগের দায়িত্বশীল ভূমিকার কারণে ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত সুন্দরবনে কোনো আগুন ঘটেনি বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমি সুন্দরবন এলাকার মানুষ। কোথায় এবং কীভাবে আগুন লাগে, সে বিষয়ে আমার ধারণা আছে। আমরা গাইডলাইন দিয়েছি এবং বন বিভাগ দায়িত্ব পালন করেছে। এ বছর আমরা সুন্দরবনের আগুন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছি।’
সেন্টমার্টিনে প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ সেন্টমার্টিনের পরিবেশ রক্ষায় জাহাজে করে প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবহন বন্ধের উদ্যোগের কথা জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সেন্টমার্টিনে কোনো জাহাজে করে যেন প্লাস্টিক বর্জ্য না যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পরিষ্কার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করব।’
এ বছর দুই কোটি ৮৪ লাখ গাছ লাগানো হয়েছে বনায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘চলতি বছর এখন পর্যন্ত দেশে প্রায় দুই কোটি ৮৪ লাখ গাছ লাগানো হয়েছে।’
ভবিষ্যতে এ সংখ্যা আরো বাড়ানোর আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমি অত্যন্ত আশাবাদী যে আগামীতে আমরা ২৫ কোটি নয়, আরো বেশি গাছ লাগাতে পারব। বিভিন্ন জায়গায় যে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হচ্ছে, এগুলোকে আমি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে দেখি।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের প্রশংসা করে পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘জাবিকে পলিথিনমুক্ত করতে পারলে অন্যদের জন্য অনুকরণীয় হবে। বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ সবুজ ক্যাম্পাস। অতিথি পাখি, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের কারণে জাহাঙ্গীরনগরের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের অনুরোধ করব, আপনারা বিষয়টি খেয়াল করবেন। ক্যাম্পাসকে যদি আপনারা পলিথিনমুক্ত করতে পারেন, তাহলে তা অন্যদের জন্য অনুকরণীয় হবে।’
নারী হলের নিরাপত্তা নিয়ে ভিসি উদ্বেগ সভাপতির বক্তব্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে মীর মশাররফ হোসেন হল থেকে বিশমাইল পর্যন্ত সড়কের পাশে সুউচ্চ বৃক্ষ লাগানো গেলে তা পরিবেশের পাশাপাশি নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাতেও ভূমিকা রাখবে।’
নারী হলগুলোর অবকাঠামো প্রসঙ্গে ভিসি বলেন, ‘আগের প্রশাসনের উন্নয়নকে দৃশ্যমান করার সিদ্ধান্তে নারী শিক্ষার্থীদেরও দৃশ্যমান করে ফেলা হয়েছে। আমি এই দুর্বল সিদ্ধান্তের নিন্দা জানাই।’
তিনি বলেন, ‘আরিচা মহাসড়ক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী হলগুলো দৃশ্যমান হওয়ায় রাতে শিক্ষার্থীরা এক ধরনের অস্বস্তি ও ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।’
বিষয়টির সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মো: শামসুল আলম, প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো: সোহেল রানা, পরিবেশ অধিদফতরের প্রকল্প পরিচালক ড. আবদুল্লাহ আল মামুন, ইউএনআইডিও বাংলাদেশের জাতীয় প্রকল্প সমন্বয়কারী সত্য ভট্টাচার্য, কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ আলমগীর হোসাইন, বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, জাকসু নেতৃবৃন্দ, ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী ও শিক্ষার্থীরা।



