কুষ্টিয়ায় বসতভিটা নিয়ে বিরোধের জেরে ফুফাতো ভাইদের হামলায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের কর্মকর্তা ও কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক মসলেম আলী মন্ডল (৫৫)।
শুক্রবার (১৯ জুন) সকাল সাড়ে ৬টায় ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে তিনি মারা যান।
নিহত মসলেম মন্ডল সদর উপজেলার হররা ডাক্তারপাড়ার আবেশ মন্ডলের ছেলে। স্ত্রী জেসমিন রহমান ও পাঁচ বছরের কন্যা মুমতাহিনা রয়েছেন তার পরিবারে। মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় শোক ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
শনিবার সকালে এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে শিক্ষক মসলেম মন্ডলের লাশের কফিনের চারপার্শ্বে আত্মীয় স্বজন ও এলাকাবাসী ঘিরে রেখেছেন। নিহত শিক্ষকের বড় ভাইয়ের মেয়ে বুলু বেগমের আহাজারি যেন থামছে না। সকলের চোখে মুখে বিষাদের ছায়া।
এলাকাবাসী জানান, শিক্ষক মসলেম মন্ডলের পৈত্রিক ভিটার চার শতাংশ জমি নিজেদের দাবি করে তার ফুফাত ভাই রওশন মন্ডলের ছেলে জহুরুল ইসলাম পাকা ঘর তুলে বসবাস করে আসছে। স্থানীয়ভাবে বহু সালিশ বৈঠকেও এর সমাধান না হওয়ায় আদালতে পর্যন্ত গড়ায়। স্থানীয় আদালত ও হাইকোর্ট থেকে মসলেম মন্ডলের পক্ষে রায় হয়। আদালত থেকে ওই জমির প্রকৃত মালিক মসলেম মন্ডলকে জমি বুঝিয়ে দিতে গত বছর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পুলিশ এলাকায় এলে উত্তেজনা শুরু হলে পুলিশ এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
নিহত শিক্ষকের বড় ভাইয়ের মেয়ে বুলু বেগম জানান, গত বুধবার বিরোধপূর্ণ জমির ওপর অবস্থিত একটি আমবাগানে আম পাড়াকে কেন্দ্র করে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বাড়ির পাশে রওশন মন্ডলের ছেলে জহুরুল ও মামুন, বিশু মন্ডলের ছেলে আশরাফুল, শাজাহান মন্ডলের ছেলে মিঠুন ও জয়নাল মন্ডলের ছেলে উজ্জল ও মাহাবুল মন্ডল শিক্ষক মসলেম মন্ডলের উপর আক্রমণ করে। এ সময় হাতুড়ি ও লাঠি দিয়ে উপর্যুপরি শরীরের সর্বত্র মারাত্মক আঘাত করে। এতে তার বাম পা, ডান হাত ও গোড়ালিসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হন। মসলেম মন্ডলের মৃত্যু ভেবে তারা সটকে পড়েন। পরে এলাকাবাসীর জরুরি সেবা নাম্বার-৯৯৯-এ কল পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে প্রথমে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। ওই রাতেই সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল শুক্রবার সকালে তিনি মারা যান। ঢাকায় ময়নাতদন্ত শেষে আজ শনিবার গভীর রাতে মরহুমের লাশ কুষ্টিয়ায় পৌছাই। শনিবার সকাল ৯টায় হররা গ্রামের ঈদগাহে প্রথম জানাজা এবং সাড়ে ৯টায় কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ মসজিদ প্রাঙ্গনে দ্বিতীয় জানাজা শেষে কুষ্টিয়া পৌর গোরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়।
এলাকাবাসী জানান, অধ্যাপক মসলেম উদ্দিনকে পরিকল্পিতভাবে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাকে লাঠি ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে শরীরের হাড় থেকে মাংস পৃথক করা হয়েছে।
কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান মনজুরার রহমান জানান, অধ্যাপক মসলেম মন্ডল কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের কর্মরত ছিলেন। পরে যশোর এমএম কলেজে এবং ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরে (মাউশি) সংযুক্ত ছিলেন। তিনি সহকর্মীর বর্বরত নির্যাতন ও হত্যার উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানান।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন মাতুব্বর বলেন, ঘটনার দিন পরিবারের পক্ষ থেকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করা হলে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আহত মসলেম মন্ডলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। দুইপক্ষের মধ্যে আগের মামলাও চলমান রয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে অভিযুক্ত জহুরুল ইসলামের ভাবী শিখা জানান, এই জমি নিয়ে অনেক দিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। আমার শ্বশুর এই জমির পরিবর্তে অন্য জমি বিনিময় করতে চাইলেও তিনি জমি না নিয়ে মামলা করেছিল।
ওই দিন রাতের ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি জানি না। বর্তমানে অভিযুক্তরা সকলেই পলাতক রয়েছে। এলাকাবাসী এবং সরকারি কলেজের শিক্ষকেরা এই নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে শিক্ষককে হত্যার প্রতিবাদ জানিয়েছে সেইসাথে প্রকৃত দোষীদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।



