বগুড়ায় জামায়াত আমির

সঙ্কটের কথা বললেই স্বৈরাচার ফেরার ভয় দেখায় সরকার

‘আমরা যখন তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ সঙ্কটের কথা বলি সরকার তখন স্বৈরাচার ফিরে আসবে বলে ভয়ভীতি দেখায়। অথচ দেশের মানুষ কষ্ট পাচ্ছে।’

আবুল কালাম আজাদ, বগুড়া অফিস

Location :

Bogura
বগুড়ায় জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান এমপি
বগুড়ায় জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান এমপি |নয়া দিগন্ত

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমরা যখন তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ সঙ্কটের কথা বলি সরকার তখন স্বৈরাচার ফিরে আসবে বলে ভয়ভীতি দেখায়। অথচ দেশের মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। আমরা সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এই সঙ্কট সমাধানে টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের নিয়ে গঠিত একটা টিম দিয়ে সহযোগিতা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সরকার আমাদের প্রস্তাব গ্রহণ করেনি।’

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বগুড়া সার্কিট হাউজ মিলনায়তনে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।

Bogra  Jamat Amir pic (2)--------12-9-2026

জামায়াত আমির বলেন, ‘চব্বিশের বিপ্লবের পর জনগণ দেশের আমূল সংস্কার চেয়েছিলেন। সেই সংস্কারের লক্ষে তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছিলেন। কিন্তু সরকার ক্ষমতা পাওয়ার সাথে সাথে সেই ওয়াদার বরখেলাপ করেছে। তারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করছে না। জনগণের দাবি নিয়ে আমরা সংসদে কথা বলে কিছু করতে পারিনি। তাই জনগণের দাবি নিয়ে রাজপথে নেমেছি।’

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘যেখানেই অসঙ্গতি দেখব, সেখানেই কথা বলব। তাই বলে বগুড়ার জন্য আমাকে কথা বলতে হবে এটা ভাবিনি। বগুড়া সবসময় অবহেলিত, বঞ্চিত। বগুড়া তার পাওনা বুঝে পাক এটা আমি চাই।’

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর আমরা ৫৫ বছর অতিক্রম করেছি। একটা জাতির জন্য এই সময় কম নয়। আমরা যদি মালয়েশিয়ার দিকে তাকাই, তাদের স্বাধীনতার বয়স আমাদের থেকে খুব বেশি নয়। কিন্তু মালয়েশিয়া বিশ্বে তার একটি জায়গা দখল করে নিয়েছে। আমরা যদি জাপানের দিকে তাকিয়ে দেখি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মাত্র দুই বছরের মাথায় তারা বিশ্বের সর্ববৃহৎ ইলেকট্রনিক্স মেকানিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি সুইচওভার করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ কোথায়?’

তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানিরা শোষণ করেছে, ব্যবসা করেছে। স্বাধীনতার পর এই সমস্ত সম্পত্তি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানায় চলে এসেছে। আদমজী জুট মিলকে বলা হতো বিশ্বের বৃহত্তম জুট ইন্ডাস্ট্রি। আজকে আদমজীর নাম-নিশানা মুছে গেছে। স্বাধীনতার পরে সবকিছু হরিলুট হয়েছে। এখন একটা শিল্পপার্ক করা হয়েছে। কিন্তু সেই আদমজীর গৌরব আর নেই। আমি এজন্য পাকিস্তানি বেনিয়া ব্যবসায়ীদের পক্ষ নিচ্ছি না। আমি আমাদের মানসিকতা এবং বাস্তবতার উদাহরণ দিচ্ছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘দেশে কিছু শিল্প স্থাপনা গড়ে উঠলেও তা যথেষ্ট নয়। শিল্পের মূল শক্তি হচ্ছে বিদ্যুৎ। তিনটি উৎস থেকে এই বিদ্যুৎ পাওয়া যায়- তেল, গ্যাস এবং সোলার। বর্তমানে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের কারণে দেশ মারাত্মক সঙ্কটে পড়েছে। শিল্পে মারাত্মক সঙ্কট দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র নেতৃবৃন্দ প্রেসিডেন্টের সাথে দেখা করে বলেছেন, চাহিদা মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়ায় তাদের উৎপাদন ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে তারা ব্যাংকের দেনা পরিশোধ করতে পারবেন না, ঋণখেলাপি হবেন, শ্রমিকদের ছাঁটাই করবেন। বায়ারদের সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করতে না পারলে বায়াররা অন্য দেশে চলে যাবেন। আমাদের বৃহত্তম রফতানি খাতের এই অবস্থা হলে বাকিগুলো এখান থেকেই বোঝা যায়।’

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমরা সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এই সঙ্কট সমাধানে টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের নিয়ে গঠিত একটা টিম দিয়ে সহযোগিতা করতে চেয়েছিলাম। তারা সরকারের এই বিষয়ের এক্সপার্টদের সাথে মিলে সঙ্কট সমাধানের পথ তৈরি করবেন। আমরা দেশকে ভালোবাসি, এজন্য এই অফার দিয়েছি। বাংলাদেশের সংসদের ইতিহাসে বিরোধী দল কখনো সরকারি দলকে এরকম অফার দেয়নি। এর আগে তেলের সঙ্কট দেখা দিলে পাম্পে পাম্পে ঘুরেছি, মানুষের সাথে কথা বলেছি, সংসদে কথা বলেছি, সরকার সঙ্কট অস্বীকার করেছে। বিদ্যুতের সঙ্কটও তারা অস্বীকার করেছে। আজগুবি কথা বলেছে, দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলেছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী সংসদে বিবৃতিতে বলেছেন, তার লম্বা হওয়ার কারণে কারেন্টের সাপ্লাই ঠিকমতো দেয়া যায়নি। সংসদের ভেতরে যখন দেখলাম কিছু করতে পারছি না, তখন এই দাবির সাথে আরো পাঁচটি দাবি নিয়ে রাজপথে নেমেছি। আন্দোলনের দ্বিতীয় ধাপে এখন লংমার্চ করছি। তিনি বলেন, লংমার্চ নিয়ে অনেক কথা বলা হচ্ছে। বলা হয় তেল সঙ্কটের মধ্যে আমরা এত গাড়ি নিয়ে কেন লংমার্চ করছি? আমরা লংমার্চ না করলেও এসব গাড়ি বসে থাকত না, তারা চলাচল করত। বরং আমরা লংমার্চের মাধ্যমে জনগণের দাবি আদায়ের আন্দোলন করছি। এভাবেই একদিন জনগণের দাবি পূরণ হবে। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।’

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘বিরোধী দল হিসেবে আমাদের কাজ হলো জনগণের অধিকারের পাহারাদারি, চৌকিদারি করা, ভ্যানগার্ড হিসেবে কাজ করা। বিরোধী দলের হাতে কখনো স্বৈরশাসন কায়েম হয় না। বরং শাসক সুশাসক হতে পারে, স্বৈরশাসক হতে পারে। আমরা স্বৈরশাসকের কবলে সাড়ে ১৫ বছর ছিলাম। আমাদের অনেক নেতাকে হারিয়েছি। অনেকে গুম হয়ে এখনো ফিরে আসেনি। স্বজনরা জানেন না তাদের প্রিয়জনরা বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে।’

জামায়াত আমির বলেন, ‘চব্বিশের বিপ্লবের পর জনগণ দেশের আমূল সংস্কার চেয়েছিলেন। আমরা সংস্কারের পক্ষে ছিলাম। দেশবাসীকে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিতে বলেছিলাম। জনগণ আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়েছে। প্রদত্ত ভোটের ৬৮ দশমিক ২ ভাগ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছে। কিন্তু সরকার ক্ষমতা পাওয়ার সাথে সাথে তাদের দেয়া ওয়াদার বরখেলাপ করল। তারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করছে না।’

তিনি ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘১৯৭০ সালে ভোটের রায় অমান্য করার কারণেই যুদ্ধ হয়েছিল। শেখ মুজিব দফায় দফায় ইয়াহিয়া খানের সাথে বৈঠক করেছেন শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য, রায় মেনে নিয়ে সংসদ সদস্যদের শপথের ব্যবস্থা করা এবং সংসদ অধিবেশন ডাকার জন্য, সরকার গঠনের সুযোগ দেয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। কিন্তু পাকিস্তান সরকার রাজি হয়নি বলেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীন হয়েছি। কাজেই জনগণের ভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করার শক্তি আমাদের কারো নেই। জনগণ চায় তাদের রায়ের বাস্তবায়ন, আমরা সেই দাবিগুলো নিয়েই আন্দোলন করছি।’

সাংবাদিকদের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ দিয়ে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা সবসময় আপনাদের কাছ থেকে সহযোগিতা পাই। কিন্তু মাঝে মাঝে উল্টাপাল্টা দুয়েকজন করেন। আমাদের বক্তব্য কাটছাঁট করে প্রচার করা হয়। তারপরেও আমরা মিডিয়ার ব্যাপারে শ্রদ্ধাশীল। কখনো মিডিয়াকে আঘাত করে কথা বলি না। কারণ এটা হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে পাওয়ারফুল পিলার। এটা সততার উপরে থাকলে রাষ্ট্রের অবশিষ্ট তিনটি স্তম্ভ সোজা পথে চলতে বাধ্য।’

তিনি একটি সুন্দর দেশ গঠনে সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রত্যাশা করেন।

মতবিনিময়কালে বগুড়া মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেল, ইফসুর মহাসচিব ড. মোস্তফা ফয়সাল পারভেজ, জামায়াত নেতা নূর মোহাম্মাদ আবু তাহের, অধ্যক্ষ ইকবাল হোসেনসহ স্থানীয় জামায়াত নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কর্মরত সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

মতবিনিময় শেষে জামায়াত আমির হোটেল মম ইন কনভেনশন সেন্টারে বগুড়া জেলা ও মহানগর জামায়াতের রুকন সম্মেলনে যোগদান করেন। শনিবার স্থানীয় মম ইন কনভেনশন সেন্টারে বগুড়া মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেলের সভাপতিত্বে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও বগুড়া অঞ্চল পরিচালক এ টি এম আজহারুল ইসলাম এমপি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দীন, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি গোলাম রব্বানী, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও বগুড়া অঞ্চল সহকারী পরিচালক অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, বগুড়া জেলা আমির অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল হক সরকার, সিরাজগঞ্জ জেলা আমির মাওলানা শাহীনূর আলম এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষা বিভাগের সদস্য সৈয়দ আব্দুল আজিজ।

মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি আসম মালেক ও জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা মানছুরুর রহমানের যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে বগুড়া জেলা ও মহানগরের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার পুরুষ ও মহিলা রুকন অংশগ্রহণ করেন।

সম্মেলনে সাংগঠনিক কার্যক্রম, দায়িত্বশীলদের করণীয় এবং বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে রুকনদের ভূমিকা নিয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়।

শহীদ আব্দুল মালেকের কবর জিয়ারত বিরোধীদলীয় নেতার

জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ আব্দুল মালেকের কবর জিয়ারত করেছেন।

তিনি শনিবার সকালে বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলার মানিকপোটল (মরিচতলা) গ্রামে শহীদ আব্দুল মালেকের কবর জিয়ারত করেন। এসময় তিনি শহীদ আব্দুল মালেকের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ফাতিহা পাঠ করেন এবং শহীদ আব্দুল মালেকের শাহাদাত কবুলের জন্য মহান আল্লাহর নিকট দোয়া করেন।

এরপর ডা: শফিকুর রহমান স্থানীয় মাদরাসায় শহীদ আব্দুল মালেকের পরিবারের সদস্যদের সাথে মতবিনিময় করেন।

তার আগমন উপলক্ষে স্থানীয় মাদরাসা মাঠে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ উপস্থিত হন।

ডা: শফিকুর রহমান উপস্থিত জনগণের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, ‘দেশের মানুষ ভালো নেই, দেশ ভালো নেই। বিদ্যুৎ এবং সারসঙ্কট চরমে। দেশের মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। আমরা জনগণের কষ্টের কথা জাতীয় সংসদে বলার চেষ্টা করছি, সরকার আমাদেরকে কথা বলতে দিচ্ছে না। বাধ্য হয়ে জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য আমরা রাজপথে নেমেছি।

এ সময় জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম এমপি, নির্বাহী পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিন, জেলা নায়েবে আমির অধ্যাপক আব্দুল বাছেদ, ধুনট উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আমিনুল ইসলামসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

এরপর তিনি শহীদ আব্দুল মালেক ফাউন্ডেশন ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এর আগে শুক্রবার রাতে বগুড়ায় এসে সার্কিট হাউজে রাত্রী যাপন করেন ডা: শফিকুর রহমান।