নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার সোনালী ব্যাংক শাখার অর্ধশতাধিক গ্রাহকের কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা নৈশ প্রহরী ফিরোজ মিয়া। এ ঘটনায় ব্যাংক পাড়ায় গ্রাহকদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপক জানান, এ ব্যাপারে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।
গ্রাহকদের অভিযোগ ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ইসমাইল গ্রামের কছির উদ্দিনের ছেলে ফিরোজ মিয়া ১৫-২০ বছর ধরে সোনালী ব্যাংক শাখার নৈশ প্রহরী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। নৈশ প্রহরী পদে থাকলেও ফিরোজ মিয়া অফিস চলাকালীন সময়ে ব্যাংকের গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট খোলা, লোনের ফাইল সাজানো, টাকা জমা ও উত্তোলন করাসহ যাবতীয় কাজে গ্রাহকদের সহযোগিতা করতেন।
এভাবে দিনের পর দিন কাজ করার ফলে তিনি গ্রাহকদের বিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্যাংকে কর্মরত অনেক কর্মকর্তা নিজের দায়িত্ব ভুলে গিয়ে ফিরোজকে দিয়ে ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করিয়ে নেন। সেই থেকে নৈশ প্রহরী ফিরোজ হয়ে ওঠেন ব্যাংকের সর্বেসর্বা।
গ্রাহকদের ধারণা ছিল, ফিরোজ যা করবে তাই হবে। সে কারণেই গ্রাহকরা সময় অপচয় না করে ফিরোজের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ লেনদেন করতেন।
ব্যাংকে সেবা নিতে আসা গ্রাহক ছাদিকুল মিয়া বলেন, সোনালী ব্যাংকে লোন করতে এলে আগে ফিরোজের সাথে কথা বলতে হতো। ফিরোজ যার বিষয়ে ম্যানেজার বা অন্যান্য কর্মকর্তাদের সুপারিশ করতেন তার কাজ আগে হতো। এমনকি ফিরোজ ব্যাংকে লোন করতে আসা শিক্ষক, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, কৃষকসহ সবার কাছ থেকে ব্যাংকে লোন করে দেয়ার কথা বলে ফাঁকা চেক বইয়ের পাতা, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, অলিখিত স্ট্যাম্প ও পাসপোর্ট সাইজের ছবি নিয়ে রাখত। পরে সেইসব গ্রাহকের নামে মোটা অঙ্কের লোন পাশ করে নিয়ে গ্রাহকদের নামমাত্র টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বিদায় দিতো।
তিনি আরো বলেন, কয়েক বছর পর ব্যাংক থেকে নোটিশ গেলে গ্রাহকরা লোনের পরিমাণ দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েন। কিন্তু তাদের আর কিছুই করার থাকে না। বাধ্য হয়ে জমি, জায়গা, ঘরবাড়ি বিক্রি করে ব্যাংকের লোন পরিশোধ করতে বাধ্য হন গ্রাহকরা। সঠিক তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেড়িয়ে আসবে। শুধু নৈশ প্রহরী ফিরোজ নয়, ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা এর সাথে জড়িত। এটাকেই বলে ডিজিটাল দুর্নীতি।
সোনালী ব্যাংকের গ্রাহক তহুরা (তহুজা) বেগম বলেন, আমি সোনালী ব্যাংকের কিশোরগঞ্জ শাখায় একটি এফডিআর করেছিলাম। এফডিআরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর আমি ব্যাংকে টাকা উত্তোলন করতে গিয়েছিলাম। নৈশ প্রহরী ফিরোজ আমাকে জানায়, আপনি চেকবই দিয়ে যান, আমি সবকিছু রেডি করে রাখব। আপনি কয়েক দিন পরে এসে টাকা নিয়ে যাবেন।
তিনি আরো বলেন, দুই-তিন দিন পর ব্যাংকে টাকা উত্তোলন করতে গিয়ে জানতে পারি, আমার অ্যাকাউন্ট শূন্য। পরে বিষয়টি ম্যানেজারকে জানালে তিনি আমার টাকার দায়িত্ব নেন।
কত টাকার এফডিআর করেছিলেন প্রশ্ন করলে গ্রাহক তহুরা বলেন, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কাউকে তথ্য দিতে নিষেধ করেছে। তারা বলেছে, বিষয়টি অন্য কাউকে জানালে আমার টাকা ফেরত পাব না।
ব্যাংকের অপর গ্রাহক আরজিনা বেগম বলেন, আমি মাদরাসায় চাকরি করি। ফিরোজ আমার বেতনের ২৮ হাজার টাকা তুলে নিয়েছে।
নৈশ প্রহরী ফিরোজের বাবা কছির উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, আমার ছেলে ব্যাংকের অনেক গ্রাহকের টাকা উত্তোলন করে নিয়েছে। এর মধ্যে গাড়াগ্রামের তহুড়া বেগমসহ কয়েকজনের ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যাংক ম্যানেজার পংকজ কান্তি রায়ের মাধ্যমে ফেরত দিয়েছি। এতগুলো টাকা আমার ছেলে কী করেছে তা আমার জানা নেই।
ছেলে কতগুলো টাকা নিয়েছে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, শুনেছি সবগুলো মিলে প্রায় কোটি টাকা।
কিশোরগঞ্জ সোনালী ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপক পংকজ কান্তি রায়ের কাছে ব্যাংকের কতজন গ্রাহকের আমানত খোয়া গেছে, খোয়া যাওয়া আমানতকারীর সংখ্যা, টাকার পরিমাণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ব্যাংকের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ায় আশঙ্কায় এসব তথ্য এই মুহূর্তে দেয়া যাবে না।
তবে তিনি বলেন, সোনালী ব্যাংকের নৈশ প্রহরী ফিরোজ মিয়া ২০ জুলাই থেকে হঠাৎ করে ব্যাংকে আসা বন্ধ করে দেন। তার বিষয়ে খোঁজখবর নিলে তার পরিবারের লোকজন জানান, সে জরুরি কাজে ঢাকায় গেছে। তার ব্যবহৃত মোবাইলফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তাকে না পাওয়ায় তার বাড়িতে নোটিশ পাঠানো হয়। পরে এই সংবাদ জানার পর সোনালী ব্যাংকের ১০-১৫ জন আমানতকারী ব্যাংকে এসে তাদের অ্যাকাউন্টে টাকা না পেলে বিষয়টি আমরা জানতে পারি।
তিনি আরো বলেন, ইতোমধ্যে কয়েকজন গ্রাহককে ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা ফেরত দিয়েছি।
কিশোরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল গফুর মিয়া সাধারণ ডায়েরির (জিডির) বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, কিশোরগঞ্জ সোনালী ব্যাংকের নৈশ প্রহরী ২০ জুলাই থেকে নিখোঁজ রয়েছে। সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার এ ঘটনায় একটি মিসিং ডায়েরি করেছেন।



