নদী পাড় না হয়ে স্কুলে যাওয়ার বিকল্প কোনো পথ নেই। তাই গ্রীষ্ম, বর্ষা কিংবা শীত বারো মাসই খাল সাঁতরে স্কুলে যেতে হয়। বাড়ি থেকে স্কুলে যেতে প্রতিদিন পাঁচটি খাল সাঁতরে পাড় হতে হয় জহিরুলকে, আবার ফেরত যেতেও পাড়ি দিতে হয় পাঁচটি খাল। এমনই আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছে গলাচিপা সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিচ্ছিন্ন অংশ চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র জহিরুল।
শুধু জহিরুল নয়, তার মতো এমন দুর্দশায় বিভিন্ন শ্রেণিতে পড়ুয়া সোহাগ, আব্দুল্লাহ, লামিয়া, হাসিবসহ অধিকাংশ শিক্ষার্থীরই প্রতিদিনের বাস্তবতার চিত্র এটি। স্কুলে যাতায়াতের জন্য তাদের নেই কোনো নৌযান, সড়ক কিংবা বিকল্প ব্যবস্থা। প্রতিদিন সকালে সব প্রান্তের শিশুরা যখন হাসি মুখে বই খাতা নিয়ে স্কুলের পথে বের হয়, তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যেতে একের পর এক খাল সাঁতরে অথবা বুক সমান পানিতে হেঁটে পাড়ি দিতে হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয় পড়ুয়া এসব শিশুদেরকে। স্কুলে পৌঁছে ভেজা জামা পাল্টে স্কুলের নির্দিষ্ট পোশাক পরিধান করে শিক্ষার্থীরা। অনেক সময় ভেজা জামা পড়েই ক্লাসে অংশ নেয় বেশির ভাগ শিক্ষার্থী।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গলাচিপা সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিচ্ছিন্ন অংশ চরকারফারমা। এর দক্ষিণে ম্যানগ্রোভ বন, এরপরই বঙ্গোপসাগর। পশ্চিমে রাবনাবাদ নদী, পূর্বে তেঁতুলিয়া নদী ও উত্তরে আগুনমুখা। চারদিকের নদী বিশিষ্ট বিচ্ছিন্ন এই চরে নেই কোনো সড়ক যোগাযোগ। গলাচিপা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে বোয়ালিয়া স্লুইসগেট থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার পায়ে হেঁটে পৌছাতে হয় আগুনমুখা নদীর তীরে খেয়াঘাট।
নদী পাড় হয়ে কারফারমা দ্বীপে যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম নৌকা। আগুনমুখার মোহনার কোলে গড়ে ওঠা চর কারফারমা দ্বীপটি প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা। তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কঠিন বাস্তবতা। নদী ঘেরা এই চরে নেই বেড়িবাঁধ, পাকা রাস্তা বা নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা। বর্ষায় জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় রাস্তাঘাট ও স্কুলের মাঠ। ফলে প্রতিদিনই স্কুলে যাওয়া শিশুদের কাছে একটি সংগ্রামে পরিণত হচ্ছে। একই দুর্ভোগ পোহাতে হয় শিক্ষকদেরও।
স্থানীয় অনেকের ভাষ্যমতে, প্রায় ১০০ জেলে-কৃষক পরিবারের প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষের বসবাস এখানে। এ চরের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রাক-প্রাথমিকসহ ছয়টি শ্রেণির ৫১ শিক্ষার্থীর বিপরীতে তিনজন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। তবে যোগাযোগ সঙ্কটে ধীরে ধীরে অনেক শিশুই স্কুলে আসার আগ্রহ হারাচ্ছে।
প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী হাসিবুল ইসলাম ও দ্বিতীয় শ্রেণির আছিয়া বলে, বৃষ্টি ও খালের পানিতে শরীর প্রায়ই ভেজা থাকে। ভেজা শরীর নিয়ে ক্লাস করতে হয়। এতে অসুস্থ হয়ে পড়লে কয়েকদিন আবার স্কুলে যাওয়া হয় না। আমাদের একটা নৌকা আছে। কিন্তু ওই নৌকা দিয়ে বাবা নদীতে মাছ ধরতে যায়। তাই খাল সাঁতরেই স্কুলে যেতে হয়।
চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মো: নেছার উদ্দিন বলেন, ‘রাস্তাঘাট না থাকায় আমাদের অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। আমরা খেয়া বা স্থানীয় জেলেদের নৌকায় যাতায়াত করতে পারলেও শিক্ষার্থীদের খাল সাঁতরে আসতে হয়। স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় বাচ্চাদের খাবার স্কুলে পৌঁছাতেও সংশ্লিষ্টদের বেগ পেতে হয়। তবে রাস্তাঘাট হলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়বে বলে আশা করা যায়। এই এলাকায় বিএ পাস যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তি না থাকায় বিদ্যালয়ে সভাপতি নির্বাচন করতে পারিনি। এ বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’
বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি শাহিদা বেগম জানান, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি জায়গা দিয়েছেন। কিন্তু নিজেদের উদ্যোগে রাস্তা করার সামর্থ্য তাদের নেই। স্কুলে যাতায়াতের জন্য হলেও কিছু রাস্তাঘাট নির্মাণ করা খুব দরকার বলেও জানান তিনি।
সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো: জাহাঙ্গীর হোসেন টুটু জানান, স্কুলে যাওয়ার রাস্তা নেই, এ কথা সত্য। আপাতত কোনো বরাদ্দ নেই। বরাদ্দ পেলে অবশ্যই রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হবে।
গলাচিপা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো: গোলাম সগীর বলেন, ‘রাস্তা না থাকার কারণে স্কুলের শিক্ষার্থী কমে গেছে। বিষয়টা দুঃখজনক। স্কুলে যাওয়ার রাস্তা না থাকার বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহোদয়কে জানিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
ইউএনও আবুজর মো: ইজাজুল হক জানান, বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হবে। জায়গাটি পরিদর্শনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।
এ ব্যাপারে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী এবং পটুয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো: নুরুল হক বলেন, ‘বাচ্চাদের পড়াশোনার একটা উপযোগী পরিবেশ তৈরি করার জন্য বড় ধরণের বাজেট দরকার। আমাদের পক্ষ থেকে অন্তত একটা নৌকা বা ট্রলার দিয়ে খুব দ্রুত তাদের একটা যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’



