ব্রাহ্মণপাড়ায় সাইনবোর্ডেই সীমাবদ্ধ ফায়ার স্টেশন, ক্ষতি ২০ কোটি

উপজেলা প্রতিষ্ঠার ৪২ বছর পেরিয়ে গেলেও ব্রাহ্মণপাড়ায় নিজস্ব ফায়ার সার্ভিস স্টেশন না থাকা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ স্টেশন চালু না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের আগুনে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরো বাড়তে পারে।

Location :

Cumilla
ফায়ার সার্ভিসের জন্য নির্ধারিত স্থান
ফায়ার সার্ভিসের জন্য নির্ধারিত স্থান |নয়া দিগন্ত

বুড়িচং (কুমিল্লা) সংবাদদাতা
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন নির্মাণের উদ্যোগ দীর্ঘ নয় বছর ধরে কেবল জমি অধিগ্রহণ ও সাইনবোর্ড টাঙানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। গত পাঁচ বছরে আগুনে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি টাকা।

ফায়ার সার্ভিস স্টেশন না থাকায় আগুনের ঘটনায় পাশের উপজেলা বুড়িচং অথবা কসবা কিংবা কুমিল্লা শহর থেকে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট আসার অপেক্ষায় থাকতে হয় স্থানীয়দের। দূরবর্তী স্থান থেকে ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে নেয়ার আগেই তা ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রতিবছর ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও মূল্যবান সম্পদের পাশাপাশি জানমালের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ছে।

স্থানীয়দের দাবি, উপজেলা প্রতিষ্ঠার ৪২ বছর পেরিয়ে গেলেও ব্রাহ্মণপাড়ায় নিজস্ব ফায়ার সার্ভিস স্টেশন না থাকা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ স্টেশন চালু না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের আগুনে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরো বাড়তে পারে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে ব্রাহ্মণপাড়ায় ১৪টি ছোট-বড় আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২৯টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগুনে আনুমানিক দুই কোটি নয় লাখ ৫০ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, গত পাঁচ বছরে আগুনে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি টাকা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়মতো ফায়ার সার্ভিস ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারায় আগুনের ক্ষয়ক্ষতি অনেক ক্ষেত্রে বেড়ে যায়।

ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা সদর বাজারসহ সাহেবাবাদ, মালাপাড়া, চান্দলা, শিদলাই, শশীদল, মিরপুর ও বড়ধুশিয়া এলাকার হাট-বাজার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে অগ্নিঝুঁকিতে। ঘনবসতিপূর্ণ এসব এলাকায় আগুন লাগলে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

এ ছাড়া হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানও রয়েছে ঝুঁকির মধ্যে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে খোলামেলাভাবে বোতলে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল বিক্রি করায় আগুনের আশঙ্কা আরো বাড়ছে।

পাশের উপজেলার ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, ব্রাহ্মণপাড়ার কোথাও আগুন লাগলে প্রথমে পাশের উপজেলা বুড়িচং, কসবা অথবা কুমিল্লা জেলা শহরের ফায়ার সার্ভিস ইউনিটে খবর দিতে হয়। ঘটনাস্থল থেকে এসব ইউনিটের দূরত্ব বেশি হওয়ায় গাড়ি পৌঁছাতে সময় লাগে।

এই সময়ের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছানোর পরও তখন অনেক ক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয়দের মতে, উপজেলা সদরে নিজস্ব ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থাকলে আগুনের শুরুতেই কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হতো।

জানা গেছে, প্রায় নয় বছর আগে উপজেলার সাহেবাবাদ এলাকায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নির্মাণের জন্য ৩৬ দশমিক ৭৫ শতক জমি অধিগ্রহণ করা হয়। নির্ধারিত স্থানে স্টেশন নির্মাণের কথা উল্লেখ করে সাইনবোর্ডও টাঙানো হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সাইনবোর্ডের বাইরে সেখানে কোনো দৃশ্যমান নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ ও হতাশা। তাদের প্রশ্ন—জমি অধিগ্রহণের পরও কেনো বছরের পর বছর ধরে পড়ে আছে গুরুত্বপূর্ণ এই সরকারি প্রকল্প?

কুমিল্লা জেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক ইকবাল হোসেন বলেন, ‘ব্রাহ্মণপাড়ায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। দ্রুত কাজ শুরু করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’

ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুন্নি ইসলাম বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে ব্রাহ্মণপাড়ায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন অত্যন্ত জরুরি। বিষয়টি দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করব।’

ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি শাহ আলম খোকন বলেন, ‘ব্রাহ্মণপাড়ায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন খুবই প্রয়োজন। যেকোনো মুহূর্তে আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিস ছাড়া পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন। দ্রুত নির্ধারিত স্থানে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন করা হোক।’

কুমিল্লা-৫ আসনের সংসদ সদস্য হাজী জসিম উদ্দিন বলেন, ‘ব্রাহ্মণপাড়ায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের জন্য ইতোপূর্বেই আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করেছি। আশা করছি, খুব শিগগির ভবন উদ্বোধনের কাজ শুরু করতে পারব।’

প্রায় এক দশক ধরে জমি অধিগ্রহণ ও সাইনবোর্ড টাঙানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। তাদের দাবি, আর আশ্বাস নয়, এবার দ্রুত দৃশ্যমান নির্মাণকাজ শুরু করতে হবে।

স্থানীয়দের মতে, ব্রাহ্মণপাড়ায় একটি পূর্ণাঙ্গ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন চালু হলে আগুনের পর দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা ও আগুন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এতে জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি আগুনে প্রতিবছর যে বিপুল পরিমাণ সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে, সেটিও অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।