কিশোরগঞ্জে বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে হত্যা, আটক ৩ ভাড়াটে খুনি

‘আওয়ামী স্বৈরাচারের পতন হলেও তাদের অনুসারীদের অস্ত্রের ঝনঝনানি ও রক্তপাত থেমে নেই। জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।’

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি

Location :

Kishoreganj
(বা থেকে ১ম) নিহত জাহিদুল আলম ওরফে জাহাঙ্গীর, পরবর্তী তিনজন আটক তিন ভাড়াটে খুনি
(বা থেকে ১ম) নিহত জাহিদুল আলম ওরফে জাহাঙ্গীর, পরবর্তী তিনজন আটক তিন ভাড়াটে খুনি |নয়া দিগন্ত

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম ওরফে জাহাঙ্গীরকে (৫২) কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত তিনজনকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে টাকার চুক্তিতে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এ তথ্য জানান।

পরে সন্ধ্যায় তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আটক তিনজন স্বীকার করেছেন জাহাঙ্গীরকে হত্যা করার জন্য তাদের ভাড়া করে আনা হয়েছিল। কত টাকার চুক্তিতে এবং কারা তাদের ভাড়া করেছেন, তা জানার চেষ্টা চলছে।

আটক ব্যক্তিরা হলেন— বরগুনার বামনা উপজেলার চালিতাবুনিয়া গ্রামের মরহুম সুলতানের ছেলে মো: হেলাল (২৫), লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার দুধরাজপুর গ্রামের মো: নূর হোসেনের ছেলে মো: মহিন উদ্দিন (৩২) ও একই উপজেলার মধ্যপাড়া গ্রামের রহমত উল্লাহ ওরফে খোকনের ছেলে মো: শাকিল হোসেন ওরফে শাহীন (২৫)। তাদের জেলা পুলিশের হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি চাপাতিও উদ্ধার করেছে পুলিশ।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে যায়। ঘটনাস্থলের আলামত, সার্বিক পরিস্থিতি ও প্রযুক্তির সহায়তায় হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয়া তিনজনকে শনাক্ত করা হয়। ঘটনাস্থল থেকেই একজনকে আটক করা হয়। পরে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাতেই অভিযান চালিয়ে আরো দু’জনকে আটক করা হয়। আটক তিনজনই ভাড়াটে খুনি।

এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, আটক ব্যক্তিরা টাকার বিনিময়ে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে কারা তাদের ভাড়া করেছে, সে বিষয়ে এখনই বিস্তারিত জানানো যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে জড়িত সবাইকে দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে।

এর আগে, বুধবার (১৫ ‍জুলাই) রাত সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার সদর ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ এলাকায় নিজ বাগানবাড়ির সামনে জাহাঙ্গীরকে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। এ সময় তার সাথে থাকা বিএনপি কর্মী হাদিস মিয়া গুরুতর আহত হন। জাহাঙ্গীরকে রক্ষার চেষ্টা করতে গিয়ে তিনিও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে জখম হন। তবে হামলার সময় তিনি একজন হামলাকারীকে ধরে ফেলতে সক্ষম হন।

স্থানীয় লোকজন আহত দু’জনকে প্রথমে কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক জাহাঙ্গীরকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত হাদিস মিয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

মিঠামইন উপজেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক আবদুল আওয়াল বলেন, রাতে বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে বাড়ির কাছে পৌঁছালে কয়েকজন দুর্বৃত্ত তাদের পথ অবরোধ করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে।

শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক অনন্ত বসাক বলেন, রাত সাড়ে ১১টার দিকে আহত দু’জনকে হাসপাতালে আনা হয়। এর মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই জাহাঙ্গীরের মৃত্যু হয়েছিল।

এদিকে বৃহস্পতিবার সকালে জাহাঙ্গীরের লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা করার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

হাসপাতালে জাহাঙ্গীরের লাশ দেখতে যান কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো: ফজলুর রহমান। এ সময় তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

নিহত জাহাঙ্গীরের পরিবারের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তার বিরুদ্ধে হামলা, নির্যাতন ও একাধিক মামলা হয়েছিল। এলাকায় তার জনপ্রিয়তার কারণেই তিনি হত্যার শিকার হয়েছেন।

তবে স্থানীয় কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি একাধিক মামলায় পলাতক ছিলেন। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এলাকায় তার প্রভাব বাড়ে। এ সময় মিঠামইন বাজারের নিয়ন্ত্রণ এবং বেড়িবাঁধের গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। পরে এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দল থেকে তার পদ স্থগিত করা হয়।

স্থানীয়দের কেউ কেউ ধারণা করছেন, এসব বিরোধও হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভূমিকা থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

মির্জা ফখরুলের শোক
এদিকে মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর হত্যার ঘটনায় গভীর শোক ও নিন্দা জানিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, ‘আওয়ামী স্বৈরাচারের পতন হলেও তাদের অনুসারীদের অস্ত্রের ঝনঝনানি ও রক্তপাত থেমে নেই। জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নির্মূল করার অপচেষ্টা এখনো অব্যাহত রয়েছে। তবে খুন-জখমের মাধ্যমে আওয়ামী লুটপাটের রাজত্ব আর ফিরে আসবে না।’

শোকবার্তায় মির্জা ফখরুল বলেন, জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শে বিশ্বাসী এবং উপজেলা বিএনপিকে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত করতে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। তিনি তার বিদেহী রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। একইসাথে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।