ডিমলা (নীলফামারী) সংবাদদাতা
মাছ ধরতে নদীতে জাল পেতেছিলেন জেলে। সকালে জাল তুলতে গিয়ে চোখ কপালে ওঠার মতো দৃশ্য! মাছের পরিবর্তে জালে আটকা পড়ে আছে প্রায় সাত ফুট লম্বা একটি অজগর সাপ। এমন ঘটনা ঘিরে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার তিস্তা তীরবর্তী এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক চাঞ্চল্য।
খবর ছড়িয়ে পড়তেই উৎসুক মানুষ ভিড় জমায় সাপটি একনজর দেখতে। পরে বন বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে অজগরটি উদ্ধার করেন।
ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার ১ নম্বর পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালিগঞ্জ বিজিবি ক্যাম্পসংলগ্ন তিস্তা নদী এলাকায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার (২১ জুলাই) রাতে মাছ ধরার জন্য নদীতে চায়না জাল পেতে রাখেন স্থানীয় বাসিন্দা মশিয়ার রহমান। বুধবার (২২ জুলাই) সকালে জাল তুলতে গিয়ে তিনি দেখতে পান, একটি বড় আকারের অজগর সাপ জালের মধ্যে আটকা পড়ে রয়েছে।
প্রথমে বিষয়টি দেখে তিনি ভয় পেয়ে যান। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় জালসহ সাপটিকে উদ্ধার করা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটনাটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের গ্রাম থেকে শত শত মানুষ সেখানে ভিড় করেন। অনেকেই মোবাইলফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন।
স্থানীয়রা জানান, তিস্তা নদী ও চরাঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির সাপ দেখা গেলেও এত বড় অজগর খুব কমই দেখা যায়। ফলে ঘটনাটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়।
খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) দুপুরে জেলা সামাজিক বনায়ন নার্সারি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে অজগরটি উদ্ধার করেন।
জেলা সামাজিক বনায়ন নার্সারি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিশিকান্ত মালাকার বলেন, ‘আমরা প্রায় সাত ফুট দৈর্ঘ্যের একটি অজগর উদ্ধার করেছি। সাপটি সুস্থ রয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে এটি রংপুর বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হবে। পরে উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কার্যক্রমের সাথে যুক্ত কর্মকর্তা ও তরুণ বন্যপ্রাণী গবেষক জোহরা মিলা বলেন, ‘অজগর একটি নির্বিষ ও নিশাচর প্রাণী। এটি সাধারণত মানুষের জন্য হুমকি নয়। প্রয়োজন ছাড়া চলাফেরা করে না এবং মানুষকে আক্রমণও করে না।’
তিনি বলেন, ‘অজগর পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাণী। ইঁদুরসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে এদের ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু চামড়ার জন্য অবৈধ শিকার ও পাচারের কারণে এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন-২০১২ অনুযায়ী অজগর একটি সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী। তাই এ প্রাণী হত্যা, আটক রাখা বা ক্ষতিসাধন করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিস্তা অববাহিকায় অজগরের উপস্থিতি ওই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে। তবে মানুষের বসতি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলের দূরত্ব কমে আসায় মাঝে-মধ্যেই এসব প্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে।
এদিকে বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীরা ভবিষ্যতে কোনো বন্যপ্রাণী দেখা গেলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত বন বিভাগকে খবর দেয়ার জন্য স্থানীয়দের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
তিস্তার জালে ধরা পড়া অজগরটি স্থানীয়দের জন্য যেমন বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে, তেমনি বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।



