ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) সংবাদদাতা
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে দাম কম ও ক্রেতা সঙ্কটের কারণে হিমাগারগুলোতে প্রায় দেড় লাখ বস্তা আলু আটকা পড়েছে এবং কৃষকরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। প্রয়োজনের তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় এবং চাহিদা কম থাকায় বাজারে আলুর দাম কম। ফলে হিমাগারে মজুদ রাখা আলু নিচ্ছে না কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। উৎপাদন, পরিবহন ও হিমাগার ভাড়াসহ প্রতি ৬২ কেজি ওজনের বস্তায় গড়ে প্রায় ৪৬০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।
ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (২৪ আগস্ট) পর্যন্ত হিমাগারে সংরক্ষিত আলুর প্রায় ৩৫ হাজার বস্তা খালাস হয়েছে। এখনো প্রায় দেড় লাখ বস্তা আলু হিমাগারে পড়ে আছে।
বর্তমানে হিমাগার গেটে ৬২ কেজির এক বস্তা আলু ৯২০ থেকে ৯৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ উৎপাদন, পরিবহন, বাছাই ও হিমাগার ভাড়াসহ প্রতি বস্তায় কৃষকের খরচ পড়েছে প্রায় এক হাজার ৪০০ টাকা। ফলে ৯২০ টাকা দরে বিক্রি করলে ৪৮০ টাকা এবং ৯৬০ টাকা দরে বিক্রি করলে ৪৪০ টাকা লোকসান হচ্ছে। মাঝামাঝি ৯৪০ টাকা দরে গড়ে বস্তাপ্রতি লোকসান দাঁড়াচ্ছে ৪৬০ টাকা।
উপজেলা বাজনাপাড়া গ্রামের আলমগীর হোসেন, আমড়া গ্রামের আব্দুর রশিদ ও খড়মপুর গ্রামের আব্দুল মালেকসহ কয়েকজন কৃষক জানায়, আলু বাজার নিম্নমুখী হওয়ায় তারা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। হিমাগারে রাখা আলু বিক্রি করলেই বস্তাপ্রতি গড়ে ৪৫০ টাকা লোকসান হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ দফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর উপজেলায় এক হাজার ৪৮০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়েছে। এতে উৎপাদন হয়েছে ৩৭ হাজার ২৫০ টন।
এদিকে আমন ধানের মৌসুম শুরু হওয়ায় কৃষকদের জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, সার ও শ্রমিকের মজুরিসহ বিভিন্ন খরচ মেটাতে অর্থের প্রয়োজন। সাধারণত এ সময় হিমাগারে রাখা আলু বিক্রি করে এসব খরচ মেটান তারা। কিন্তু দাম কম থাকায় আলু বিক্রি করতে না পারায় একদিকে হিমাগারে মূলধন আটকে আছে, অন্যদিকে আমন চাষের অর্থ জোগাড়েও সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
আলুর বাজারে মন্দার প্রভাব পড়েছে ব্যবসায়ীদের ওপর। ফুলবাড়ী পৌরবাজারের ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম ও জয়ন্ত সাহা জানায়, বিভিন্ন বাজারে আলু পাঠিয়েও লাভ হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে প্রতি ট্রাকে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা এবং বস্তাপ্রতি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। ফলে অনেক ব্যবসায়ী কেনাবেচা করছেন না। এদিকে খুচরা বাজারে ১২ থেকে ১৬ টাকা পর্যন্ত আলু বিক্রি হচ্ছে। আগামী ডিসেম্বর মাস থেকে আবারো আগাম নতুন আলু বাজারে উঠতে শুরু করলে, এসব পুরাতন আলুর দাম আরো কমে যাবে।
ফুলবাড়ীর মৌসুমী আলু ব্যবসায়ী ফেরাজুল ইসলাম ও নূরুল হক জানায়, সংরক্ষণ মৌসুমে অনেক ব্যবসায়ী ঋণ নিয়ে আলু কিনে মজুদ করেছিলেন। এখন বাজার পড়ে যাওয়ায় আলু বিক্রি করে সেই ঋণ পরিশোধ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক আব্দুল আউয়াল মিয়া জানান, তাদের হিমাগারে গত মার্চে এক লাখ ৭৮ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। এরমধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার বস্তা খালাস হয়েছে। এক লাখ ৪৩ হাজার বস্তা আলু এখনো হিমাগারে পড়ে আছে। হিমাগারের পক্ষ থেকে নভেম্বরের ১৫ তারিখের মধ্যে আলু খালাস করতে বলা আছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খালাস করা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
গত বছরও আলুর দরপতনের কারণে লোকসানের ভয়ে হিমাগারে আলু মজুদকারী কৃষক ও ব্যবসায়ী প্রায় ৩৫ হাজার বস্তা আলু খালাস করেননি। এসব আলুর মধ্যে কিছু আলু হিমারগার কর্তৃপক্ষ বিক্রি করতে পারলেও অধিকাংশ আলুই ফেলে দিতে হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন বলেন, ‘প্রয়োজনের তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় আলুর দাম কমেছে। বাজার সচল করা এবং কৃষক যাতে যৌক্তিক দাম পায়, সে বিষয়ে কৃষি বিভাগ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করে কাজ করছে।’



