দেশের রফতানিমুখী শিল্পায়নের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে কর্ণফুলী রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (কর্ণফুলী ইপিজেড) দুই দশকের পথচলা পূর্ণ করেছে। ২০০৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই ইপিজেডের উদ্বোধন করেছিলেন। ২০ বছরের পথচলায় ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্য রফতানি করেছে ১৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
২০০৬ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর পর কর্ণফুলী ইপিজেড থেকে প্রথম রফতানি শুরু হয় ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে। পাওলো ফুটওয়্যার (বিডি) লি. এ ইপিজেড থেকে প্রথম পণ্য রফতানি করে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ৯.৮৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দিয়ে রফতানির যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালের আগস্ট শেষে তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪,১৫৬.৪৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
কর্ণফুলী ইপিজেডের রফতানি কেবল গার্মেন্টসেই সীমাবদ্ধ নেই। গার্মেন্টসের বাইরে এখান থেকে রফতানি হচ্ছে তাঁবু ও ক্যাম্পিং সামগ্রী, বাইসাইকেল, চামড়াজাত পণ্য, ফার্নিচার, ব্যাগ, আন্ডারগার্মেন্টস, ফ্যাশন ও সেফটি শুর মতো পণ্য, যা দেশের রফতানির ঝুড়িকে বৈচিত্র্যময় করেছে। বিশ্বের অন্যতম প্রখ্যাত ব্র্যান্ড ও ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের কাছে সরবরাহ করা হয় এসব পণ্য।
কর্ণফুলী ইপিজেডের ‘দুই দশকের রূপান্তর ও বিকাশ’ নিয়ে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে আজ এ তথ্য জানানো হয়।
এ সময় বন্ধ হয়ে যাওয়া চট্টগ্রাম স্টিল মিলসের জায়গায় গড়ে ওঠা কর্ণফুলী রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (কর্ণফুলী ইপিজেড) দুই দশকের যাত্রার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
এ সময় কর্ণফুলী ইপিজেড-এর নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ সিদ্দিক, বেপজার সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) মো: তানভির হোসেন, বেপজার নির্বাহী পরিচালক (জনসংযোগ) আনোয়ার পারভেজ, কম্পবেলি গ্লোবাল লিমিটেডের সিইও লি হেঙ্গো উপস্থিত ছিলেন।
কর্ণফুলী ইপিজেড-এর নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ সিদ্দিক বলেন, চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে কর্ণফুলী নদীর তীরে একসময় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল চিটাগাং স্টিল মিলস লি.। কর্ণফুলী নদীতীরে কারখানাটির অবস্থান হওয়ায় ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে এর অভ্যন্তরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সময়ের সাথে সাথে বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা, উৎপাদন ব্যয়ের চাপ এবং ব্যবস্থাপনার নানা সমস্যার কারণে মিলটি ধীরে ধীরে লোকসানের মুখে পড়ে। ফলশ্রুতিতে ১৯৯৮ সালে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে লে-অফ ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৯৯৯ সালের ৭ জুলাই এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চিটাগং স্টিল মিলস লিমিটেড (সিএসএম) স্থায়ীভাবে কার্যক্রম বন্ধ করা হয়। ফলে বহু শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। যে এলাকায় প্রতিদিন হাজারো শ্রমিকের পদচারণা ছিল, সেখানে নেমে আসে নীরবতা। সমাপ্তি ঘটে চিটাগং স্টিল মিলসের।
তিনি জানান, তবে একটি সমাপ্তিই জন্ম দেয় আরেকটি শুরুর। এই অচলাবস্থা দূর করার জন্য তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী, বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী চিটাগাং স্টিল মিলস লিমিটেডকে চট্টগ্রাম ইপিজেডের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে পত্রের মাধ্যমে অনুরোধ করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে স্টিল মিল এলাকার জমিতে ইপিজেড স্থাপন করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পতেঙ্গার এই এলাকাকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং নতুন কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে বেপজার অধীনে শুরু হয় নতুনভাবে শিল্পায়নের উদ্যোগ।
২০০৪ সালে স্টিল মিলের জমি দুই ধাপে বেপজাকে হস্তান্তর করা হয়। প্রথম ধাপে ২০০৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ৭৪ একর এবং দ্বিতীয় ধাপে একই বছরের ২০ ডিসেম্বর ১৪৮.৪২ একর অর্থাৎ সব মিলিয়ে বিলুপ্ত চট্টগ্রাম স্টিল মিলসের সমুদয় জমি আনুষ্ঠানিকভাবে বেপজার নিকট হস্তান্তর করা হয়। শুরু হয় রূপান্তরের প্রক্রিয়া। পুরোনো স্থাপনা সরিয়ে জমি উন্নয়ন করা হয়। সেই জায়গাতেই গড়ে ওঠে একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল—কর্ণফুলী রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (কর্ণফুলী ইপিজেড)। যেখানে আধুনিক অবকাঠামো, কারখানা, ইউটিলিটি সুবিধা একত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর ২০০৬ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে কর্ণফুলী ইপিজেড উদ্বোধন করেন।
নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ সিদ্দিক বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশসহ মোট ১৪টি দেশের বিনিয়োগকারী কর্ণফুলী ইপিজেডে বিনিয়োগ করেছে। দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চীন, তাইওয়ান, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, শ্রীলঙ্কা, জাপান, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস ও মালয়েশিয়া। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ১.৯১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ নিয়ে যাত্রা শুরু করা কর্ণফুলী ইপিজেডে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৮৭.৩৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এই ইপিজেডের ২৫৮টি শিল্পপ্লট (প্রতিটির আয়তন দুই হাজার বর্গমিটার), পাঁচটি স্ট্যান্ডার্ড ফ্যাক্টরি ভবন (মোট ফ্লোর স্পেস ৪৯ হাজার ৭৯৮ বর্গমিটার)-এর পুরোটাই ইতোমধ্যে বিনিয়োগকারীদের অনুকূলে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বর্তমানে কর্ণফুলী ইপিজেডে মোট ৪০টি প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে, যার মধ্যে ২৯টি শতভাগ বিদেশী মালিকানাধীন, তিনটি যৌথ মালিকানাধীন এবং বাকি আটটি দেশীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। এছাড়া পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৮০ হাজার শ্রমিকের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান ও আরো প্রায় এক লাখ মানুষের পরোক্ষ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে বলে তিনি জানান। বাসস



