সড়ক নয় যেন ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদ!

কুমিল্লা-বাগড়া সড়কের বেহাল দশায় চরম দুর্ভোগে ৪ উপজেলার মানুষ

২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও গুরুত্বপূর্ণ কুমিল্লা-বুড়িচং-বাগড়া সড়কের বড় একটি অংশ এখনো সংস্কার হয়নি।

বুড়িচং (কুমিল্লা) সংবাদদাতা

Location :

Burichong
কুমিল্লা-বাগড়া সড়কের বেহাল দশা
কুমিল্লা-বাগড়া সড়কের বেহাল দশা |নয়া দিগন্ত

কোথাও পিচ উঠে বেরিয়ে এসেছে ইট-সুরকি, কোথাও সৃষ্টি হয়েছে গভীর গর্ত। আবার কোথাও ছোট-বড় অসংখ্য খানাখন্দ। গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে কাত হয়ে যাচ্ছে সিএনজি অটোরিকশা, উল্টে পড়ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।

ঝাঁকুনিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন যাত্রীরা। প্রতিনিয়ত নষ্ট হচ্ছে যানবাহনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। সব মিলিয়ে কুমিল্লা-বুড়িচং-বাগড়া সড়কটি এখন যেন সড়ক নয়, এক ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদ।

২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের বড় একটি অংশ এখনো সংস্কার হয়নি। ফলে কুমিল্লা আদর্শ সদর, বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মানুষের পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা ও আখাউড়া এলাকার মানুষও প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ ও ঝুঁকি নিয়ে এই সড়কে চলাচল করছেন।

প্রায় ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ কুমিল্লা সদর-বাগড়া সড়কটি এই অঞ্চলের মানুষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ।

স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন অর্ধলক্ষাধিক মানুষ সড়কটি ব্যবহার করলেও দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় এটি এখন স্বাভাবিক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে কুমিল্লা সদর উপজেলার চাঁনপুর ব্রিজ থেকে মাঝিগাছা, আমড়াতলী ইউনিয়নের তৈলকুপি বাজার হয়ে বুড়িচং উপজেলার ফকিরবাজার, কালিকাপুর, ছয়গ্রাম ও শংকুচাইল বাজার পর্যন্ত সড়কের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক।

সরেজমিনে দেখা যায়, তৈলকুপি বাজার থেকে বুড়িচংয়ের কালিকাপুর বাজার পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে গিয়ে ইট-সুরকি বেরিয়ে এসেছে। কোথাও সৃষ্টি হয়েছে গভীর গর্ত। আবার কোথাও গর্ত এতটাই বড় ও গভীর যে যানবাহন চালাতে গিয়ে চালকদের চরম ঝুঁকি নিতে হচ্ছে।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, সিএনজি অটোরিকশা ও ছোট ট্রাকগুলো এসব গর্তে পড়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এতে যানবাহনের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি যাত্রী ও পথচারীরাও আহত হচ্ছেন।

বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বৃষ্টির পানি জমে অনেক গর্ত চোখে দেখা যায় না। ফলে চালকরা গর্তের গভীরতা বুঝতে না পেরে দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়েন।

রোগী-শিক্ষার্থীসহ সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে সাধারণ মানুষ

সড়কের বেহাল দশায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, রোগী, নারী ও বয়স্করা। অসুস্থ রোগী নিয়ে কুমিল্লা শহরের হাসপাতালে যাওয়া অনেকের কাছেই এখন আতঙ্কের বিষয়। সড়কের প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে রোগীর শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি হওয়ার আশঙ্কায় অনেকে বিকল্প পথে অতিরিক্ত দূরত্ব পাড়ি দিয়ে শহরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

বুড়িচং উপজেলার ছয়গ্রাম এলাকার বাসিন্দা গাজী আকবর হোসেন বলেন, ‘সদর উপজেলার মাঝিপাছা এলাকার নন্দীর বাজার থেকে বুড়িচংয়ের গাজীপুর বাজার পর্যন্ত সড়কটির অবস্থা এতটাই খারাপ যে এটি এখন মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি বড় গর্তই যেন মৃত্যুর ফাঁদ। দিনের পর দিন মানুষ কষ্ট করছে, কিন্তু আমাদের এই দুরবস্থা দেখার যেন কেউ নেই।’

দক্ষিণগ্রাম এলাকার বাসিন্দা মেহেরাবুন্নেছা বলেন, ‘অসুস্থ শরীর নিয়ে ডাক্তার দেখাতে কুমিল্লা শহরে যেতে ভয় লাগে। এই সড়ক দিয়ে গেলে শরীরের কষ্ট আরো বেড়ে যায়। তাই বাধ্য হয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার বেশি ঘুরে অন্য সড়ক দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। এতে সময়ের পাশাপাশি ভাড়াও বেশি লাগে।’

সড়কের বেহাল দশায় শুধু যাত্রী নয়, চরম দুর্ভোগে পড়েছেন চালকরাও। খানাখন্দে চলাচল করতে গিয়ে প্রতিদিনই সিএনজি ও অটোরিকশার বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে। ফলে বাড়ছে মেরামত ব্যয়।

রঘুরামপুর এলাকার সিএনজি চালক মো: সেলিম মিয়া বলেন, ‘সিএনজি নিয়ে একদিন বের হলে পরের দুই দিন শরীরের ব্যথার কারণে ঘরে থাকতে হয়। সড়কের এমন অবস্থায় গাড়ি চালানো অত্যন্ত কষ্টকর। গাড়িরও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়। এ কারণে বাধ্য হয়ে ভাড়া কিছুটা বেশি নিতে হয়।’

সড়কের বেহাল দশার প্রভাব পড়েছে যাত্রীভাড়াতেও। স্থানীয়দের অভিযোগ, কুমিল্লা শহর থেকে গাজীপুর বাজার পর্যন্ত সিএনজির নির্ধারিত ভাড়া ৫০ টাকা হলেও সড়কের খারাপ অবস্থার অজুহাতে অনেক সময় ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেয়া হচ্ছে।

এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, সড়কটি দ্রুত সংস্কার করা হলে একদিকে যেমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে, অন্যদিকে যানবাহনের মেরামত ব্যয় ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রবণতাও কমে আসবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার পর সড়কটির বিভিন্ন অংশে ক্ষয়ক্ষতি স্পষ্ট হলেও দীর্ঘ সময়েও স্থায়ী সংস্কার করা হয়নি। ফলে সময়ের সাথে সাথে ভাঙন ও গর্তের পরিমাণ বেড়েছে।

দুই বছর ধরে সংস্কারের অপেক্ষায় থাকা সড়কটি এখন কয়েক লাখ মানুষের দুর্ভোগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—আর কতদিন এভাবে ঝুঁকি নিয়ে চলতে হবে?

বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: তানভীর হোসেন বলেন, ‘সড়কটির দুরবস্থার কথা জানি। বিষয়টি নিয়মিত সড়ক ও জনপথ বিভাগকে অবহিত করা হয়েছে। আমার জানামতে, সরকারের একটি বড় প্রকল্পের আওতায় সড়কটি নেওয়া হয়েছে। দরপত্র প্রক্রিয়াও শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং ইতোমধ্যে ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে শুনেছি। খুব দ্রুত সড়কটির সংস্কারকাজ শুরু হবে বলে আশা করছি।’

আদর্শ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমাতুজ জোহুরা বলেন, ‘সড়কটির বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগকে লিখিতভাবে জানানো হবে, যাতে দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু করা যায়।’

কুমিল্লা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘বর্তমানে বৃষ্টি ও বর্ষার মৌসুম চলায় সড়কের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। বর্ষা শেষ হলেই কাজ শুরু হবে। ইতোমধ্যে সড়কটির জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। খুব শিগগিরই সংস্কারকাজ শুরু হবে।’

দুই বছর আগে বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কুমিল্লা-বুড়িচং-বাগড়া সড়কটি এখন স্থানীয় মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াতের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়কের প্রতিটি গর্ত যেন দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রশাসনের আশ্বাস ও সংস্কারকাজ শুরুর অপেক্ষায় দিন কাটছে কয়েক লাখ মানুষের।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রতিশ্রুত প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু করে সড়কটি নিরাপদ ও স্বাভাবিক যোগাযোগপথে ফিরিয়ে আনা হবে। অন্যথায় প্রতিদিনের ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াতের মাশুল আরো কত মানুষকে দিতে হবে—সেই শঙ্কাই এখন এলাকাবাসীর।