বদলগাছী (নওগাঁ) সংবাদদাতা
বাইরে তখন ভ্যাপসা গরম। মাথার ওপর তপ্ত রোদ। উঠানে দাঁড়ালেই শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। অথচ মাটির ঘরটির ভেতরে ঢুকতেই যেন বদলে গেল পরিবেশ। বাইরে গরম, ভেতরে ঠান্ডা। নেই কোনো বৈদ্যুতিক পাখা, নেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র। মোটা মাটির দেয়ালই যেন প্রকৃতির তৈরি শীতলতার দেয়াল।
শীত এলে আবার চিত্রটা উল্টো। কনকনে ঠান্ডার মধ্যেও মাটির ঘর থাকে তুলনামূলক উষ্ণ।
এই ঘরই একসময় ছিল গ্রামবাংলার মানুষের স্বাভাবিক আবাস। ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ছিল না। মাটি, বাঁশ, কাঠ আর খড়ের ছাউনি দিয়ে গড়ে উঠত একেকটি সংসারের স্বপ্ন। মাটির দেয়ালে ফুটে উঠত গৃহিণীর হাতের আলপনা। উঠানে ছড়িয়ে থাকত শৈশবের স্মৃতি।
বদলগাছীর প্রবীণদের কাছে সেই সময় এখন অনেকটাই গল্পের মতো।
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার আটটি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে একসময় চোখে পড়ত সারি সারি মাটির বাড়ি। কোথাও একতলা, কোথাও দোতলা। কিন্তু সময়ের সাথে সেই দৃশ্য বদলে গেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া, মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পাকা বাড়ির প্রতি আকর্ষণে ইট-পাথরের দালান দখল করে নিয়েছে মাটির বাড়ির জায়গা।
মাটির ঘর এখন আর শুধু ঘর নয়—এটি বদলগাছীর হারিয়ে যেতে বসা এক ইতিহাস।
মাটি দিয়ে গড়া একেকটি সংসার
মাটির ঘর তৈরিরও ছিল নিজস্ব কৌশল। এঁটেল বা আঠালো মাটি পানিতে ভিজিয়ে কাদায় পরিণত করা হতো। এরপর দুই থেকে তিন ফুট পুরু করে তৈরি করা হতো দেয়াল। ধীরে ধীরে দেয়াল উঠত ১২ থেকে ১৫ ফুট পর্যন্ত।
দেয়াল শুকিয়ে শক্ত হলে কাঠ কিংবা বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হতো সিলিং। তার ওপর দেয়া হতো খড় অথবা টিনের ছাউনি। দক্ষ কারিগরের হাতে কখনো সেই মাটিই হয়ে উঠত দোতলা বাড়ির অবয়ব।
একটি মাটির বাড়ি তৈরি করতে সময় লাগত প্রায় ৪৫ থেকে ৬০ দিন।
তখন বাড়ি বানানো মানে শুধু ইট-বালু-সিমেন্ট জোগাড় করা নয়। পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণ, প্রতিবেশীর সহযোগিতা আর কারিগরের নিপুণ হাতে একটু একটু করে গড়ে উঠত একটি সংসারের ঠিকানা।
দেয়ালজুড়ে থাকত নারীর শিল্পকর্ম
মাটির বাড়ির দেয়াল ছিল যেন গ্রামীণ নারীদের ক্যানভাস।
শৌখিন গৃহিণীরা মাটির দেয়ালে আঁকতেন আলপনা। ফুল, লতা-পাতা, নানা নকশায় সাজিয়ে তুলতেন বসতঘর। সাদামাটা মাটির দেয়ালও তখন হয়ে উঠত নান্দনিক।
সেই আলপনা এখন আর তেমন দেখা যায় না। আধুনিক রঙিন দেয়াল, টাইলস ও পাকা ভবনের চাকচিক্যে হারিয়ে গেছে মাটির দেয়ালে আঁকা সেই লোকজ শিল্প।
‘গরিবের এসি’তে এখনো স্বস্তি
মাটির ঘরের বাসিন্দা রেজাউলের কাছে আধুনিকতার চেয়েও স্বস্তির জায়গা এই পুরোনো ঘর।
তিনি বলেন, ‘অনেক আগে তৈরি আমাদের মাটির বাড়ি। ইটের ঘর থাকলেও এখনো পরিবার নিয়ে মাটির ঘরেই থাকি। মাটির ঘরে আলাদা একটা প্রশান্তি পাওয়া যায়। গরমের সময় ঠান্ডা আর শীতের সময় উষ্ণ থাকে।’
এই স্বস্তির কারণেই স্থানীয় মানুষের মুখে মাটির ঘরের আরেক নাম—‘গরিবের এসি’।
বিদ্যুৎ ছাড়াই যে ঘর গরমে ঠান্ডা আর শীতে উষ্ণ রাখে, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে সেই ঘরের মূল্য হয়তো নতুন করে উপলব্ধি করার সময় এসেছে।
দাদার বাড়িতে প্রজন্মের বসবাস
হায়াৎ মৃদুলের বাড়িটি যেন সেই পুরোনো সময়ের একটি জীবন্ত স্মারক।
বহু বছর আগে তার দাদা তৈরি করেছিলেন মাটির দোতলা বাড়িটি। সময় বদলেছে, চারপাশে উঠেছে আধুনিক বাড়ি। কিন্তু সেই বাড়িটি এখনো টিকে আছে। পরিবারের সদস্যরাও বসবাস করছেন সেখানেই।
হায়াৎ মৃদুল জানান, শীতের সময় মাটির বাড়িতে উষ্ণ অনুভূতি পাওয়া যায়। গরমের সময় ঘর থাকে শীতল। তাই আধুনিক বাড়ির হাতছানি থাকলেও পূর্বপুরুষের তৈরি এই বাড়ি ছেড়ে যেতে মন চায় না।
এ যেন শুধু একটি বাড়িতে বসবাস নয়—নিজের শেকড়ের সাথে বসবাস।
মথুরাপুরে এখনো দেখা মেলে
বদলগাছীর মথুরাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় এখনো কিছু দৃষ্টিনন্দন মাটির বাড়ি দেখা যায়। কোনোটি বহু পুরোনো, কোনোটি আবার নিয়মিত সংস্কার করে টিকিয়ে রাখা হয়েছে।
নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকে এখনো প্রতিবছর দেয়ালে নতুন করে মাটি লাগিয়ে ঘর সংস্কার করেন। ভাঙা অংশ মেরামত করেন। কেউ কেউ পুরোনো বাড়ির সাথে নতুন টিনের ঘর যুক্ত করেছেন।
তবে নতুন করে মাটির বাড়ি তৈরির আগ্রহ প্রায় নেই বললেই চলে।
ঘর হারানোর সাথে হারাচ্ছে কারিগরও
মাটির বাড়ির সংখ্যা কমার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে এ ঘর নির্মাণের সাথে জড়িত দক্ষ কারিগররাও।
একসময় যেসব কারিগরের হাতে মাটি কথা বলত, তাদের অনেকেই এখন পেশা বদলে কৃষিজমিতে শ্রম বিক্রি করছেন। কেউ দিনমজুরি করছেন। আবার কাজের অভাবে কেউ স্থানীয় দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আগাম টাকা নিয়ে শ্রম বিক্রি করতেও বাধ্য হচ্ছেন।
অর্থাৎ মাটির ঘর শুধু একটি স্থাপত্য হারাচ্ছে না, এর সাথে হারিয়ে যাচ্ছে একটি ঐতিহ্যবাহী পেশা ও কারিগরি জ্ঞানও।
প্রবীণদের চোখে অন্য এক বদলগাছী
উপজেলার প্রবীণ ব্যক্তিরা স্মৃতিচারণ করে বলেন, একটা সময় মাটির বাড়ি ছাড়া গ্রামের চিত্র কল্পনাই করা যেত না। দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি বিত্তবান পরিবারও মাটির বাড়িতে বসবাস করত।
ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করলে এসব বাড়ি বহু বছর টিকে থাকত। বড় ধরনের বৃষ্টি বা বন্যায় ক্ষতি না হলে মাটির দেয়াল বছরের পর বছর সংসারের নিরাপদ আশ্রয় হয়ে থাকত।
কিন্তু এখন মানুষের জীবনযাত্রার মান বদলেছে। আয় বেড়েছে। বেড়েছে আধুনিক বাড়ির চাহিদা। ফলে মাটির বাড়ি ভেঙে সেখানে উঠছে পাকা ভবন।
উন্নয়ন এগিয়েছে, পেছনে পড়ে গেছে ঐতিহ্য
আধুনিক জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা মানুষের স্বাভাবিক অধিকার। আর্থিক সক্ষমতা বাড়লে মানুষ ভালো বাড়ি করবে—এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু সেই উন্নয়নের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার নিজস্ব স্থাপত্য, লোকজ সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বদলগাছীর মাটির বাড়িগুলো এখন তাই নিছক পুরোনো স্থাপনা নয়। এগুলো একেকটি পরিবারের ইতিহাস। একেকটি বাড়ির দেয়ালে লেগে আছে কয়েক প্রজন্মের হাতের ছাপ। কোথাও শৈশব, কোথাও বিয়ের স্মৃতি, কোথাও পূর্বপুরুষের গল্প।
ইট-পাথরের ঝকঝকে বাড়ি হয়তো আধুনিক জীবনের প্রতীক। কিন্তু মাটির বাড়ির দেয়ালে লেগে থাকা মাটির গন্ধে যে শেকড়ের টান, তা কি এত সহজে তৈরি করা যায়?
বদলগাছীর গ্রামগুলোতে এখনো টিকে থাকা অল্প কয়েকটি মাটির বাড়ি যেন সেই প্রশ্নই ছুড়ে দিচ্ছে।
সময়ের স্রোতে মাটির ঘর হয়তো একদিন পুরোপুরি হারিয়ে যাবে। কিন্তু গ্রামবাংলার মানুষের স্মৃতিতে ‘গরিবের এসি’ হয়ে বেঁচে থাকবে সেই মাটির ঘর—শীতের উষ্ণতা, গরমের শীতলতা আর একান্ত আপন এক জীবনের গল্প হয়ে।



