জীবিত মাকে সরকারি কাগজপত্রে মৃত দেখিয়ে বসতভিটাসহ ২১ শতক জমি বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে তারই ছেলে আব্দুল জলিলের বিরুদ্ধে।
ভুয়া মৃত্যু সনদ ও ওয়ারিশান সনদের ভিত্তিতে নান্দাইল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমি রেজিস্ট্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের।
ঘটনাটি ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার শেরপুর ইউনিয়নের রাজাবাড়িয়া গ্রামের। অভিযোগটি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা যায়, রাজাবাড়িয়া গ্রামের মরহুম জমসেদ আলীর ছেলে আব্দুল জলিল প্রায় সাত মাস আগে তার জীবিত মা রহিমাকে কাগজপত্রে মৃত দেখিয়ে বসতভিটাসহ ২১ শতক জমি প্রতিবেশী মজিবুর রহমানের কাছে বিক্রি করেন।
সম্প্রতি মজিবুর রহমান লোকজন নিয়ে ওই জমি ও বাড়ির আশপাশের পানের বরজ ও পুকুর দখলে নেয়ার চেষ্টা করলে বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের নজরে আসে।
পরে নান্দাইল সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে দলিলের নকল সংগ্রহ করা হলে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য—জীবিত রহিমাকেই কাগজপত্রে মৃত দেখিয়ে তার সম্পত্তি বিক্রি করা হয়েছে।
দলিলের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি নান্দাইল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ১১৫৪ ও ১১৫৫ নম্বরসহ তিনটি দলিলের মাধ্যমে মোট ২১ শতক জমি রেজিস্ট্রি করা হয়। জমির ক্রেতা পূর্ব রাজাবাড়িয়া গ্রামের মরহুম আমির হোসেনের ছেলে মজিবুর রহমান।
দলিলের সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন একই গ্রামের সাইফুল ইসলামের ছেলে মো: হোসেন মিয়া। দলিলটি সম্পাদন করেন দলিল লেখক ঝন্টু সরকার।
জীবিত নারীকে ‘মৃত’ বানানোর প্রমাণ মিলল সরেজমিনে
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজাবাড়িয়া গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দলিলে যাকে মৃত দেখানো হয়েছে সেই বৃদ্ধা রহিমা জীবিত। নিজের বাড়ির সামনে বসে থাকা ওই বৃদ্ধা ক্ষোভ ও অশ্রুসজল চোখে বলেন, ‘আমি তো মরছি না। তা অইলে কেরে আমারে মরা বানাইয়া জমি বেচছে? আমি এইডার কঠিন বিচার চাই।’
এ সময় তার পাশে ছিলেন আব্দুল জলিলের স্ত্রী নাছিমা বেগম, ছোট ছেলে অলি মিয়া, ছোট ছেলের স্ত্রী হাফছা বেগম ও একমাত্র মেয়ে রোকিয়া বেগম।
আব্দুল জলিলের স্ত্রী নাছিমা বেগম অভিযোগ করেন, তার স্বামী নিজের মাকে জীবিত রেখেও মৃত দেখিয়ে জমি বিক্রি করেছেন। তার দাবি, আব্দুল জলিল জুয়ায় আসক্ত। জুয়া খেলতে গিয়ে এর আগেও পরিবারের আরো জমি বিক্রি করেছেন তিনি।
ছোট ছেলে অলি মিয়া বলেন, ‘তার বড় ভাই দীর্ঘদিন ধরে জুয়ায় আসক্ত এবং ধারদেনায় জড়িয়ে পড়েছেন।’ জুয়ার দেনা পরিশোধ করতেই মাকে মৃত দেখিয়ে গোপনে জমি বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অলি মিয়া প্রশ্ন তোলেন, ‘মা যদি মারা না গিয়ে থাকেন, তাহলে তার ভুয়া মৃত্যু সনদ কে দিলো? সেই কাগজের ভিত্তিতে ওয়ারিশান সনদই বা কীভাবে হলো? আর এসব কাগজ দিয়ে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কীভাবে জমির দলিল রেজিস্ট্রি হলো?’
দলিল লেখক বলছেন, ‘দায়িত্ব আমার নয়’
অভিযোগের বিষয়ে দলিল লেখক ঝন্টু সরকার বলেন, ‘আমাকে মৃত্যু সনদ ও ওয়ারিশান দেয়া হয়েছে। সেগুলো দেখেই দলিল সম্পন্ন করেছি। যাচাই করার দায়িত্ব আমার নয়।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো: হামিদুলের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মৃত্যু সনদ ও ওয়ারিশান দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আসলে আমার ভুল হয়ে গেছে। এখন বিষয়টি দেখছি।’
এদিকে ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের ওপর নানা ধরনের চাপ ও হয়রানি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
তদন্তের দাবি
জীবিত একজন নারীকে সরকারি কাগজপত্রে মৃত দেখিয়ে তার সম্পত্তি বিক্রির ঘটনায় শুধু অভিযুক্ত ছেলে নয়, মৃত্যু সনদ ও ওয়ারিশান সনদ প্রস্তুত, অনুমোদন এবং দলিল রেজিস্ট্রির সাথে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে ভুয়া কাগজপত্র তৈরির সাথে জড়িত ব্যক্তি এবং জমি বিক্রির ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সাথে প্রতারণার মাধ্যমে রেজিস্ট্রি করা জমির দলিল বাতিল করে বৃদ্ধা রহিমার সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।



