নারায়ণগঞ্জে গণপিটুনিতে কিশোর গ্যাং প্রধান সিজান নিহত : অনুসারীদের ব্যাপক তাণ্ডব

সিজানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে তার বড় ভাই বাবুর নেতৃত্বে সিজান বাহিনী ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ২৫-৩০ জনের বাহিনী দেশীয় অস্ত্র নিয়ে এলাকায় ব্যাপক তাণ্ডব চালায়।

কামাল উদ্দিন সুমন, নারায়ণগঞ্জ

Location :

Narayanganj
নিহত কিশোর গ্যাং প্রধান সিজান
নিহত কিশোর গ্যাং প্রধান সিজান |সংগৃহীত

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম মাসদাইর এলাকায় ছিনতাইয়ের অভিযোগে কিশোর গ্যাং বাহিনী প্রধান সিজান (২৫) গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে। এই ঘটনার জের ধরে তার নেতৃত্বাধীন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ব্যাপক তাণ্ডব, ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছে।

শনিবার (৪ জুলাই) রাত ১০টার দিকে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত সিজান ওই এলাকার ইউনুছ ওরফে ইন্নু মিয়ার ছেলে।

এদিকে, ঘটনার আগে নিহত সিজান কর্তৃক মোবাইল ফোন ছিনতাই, সেটি বিক্রি করে টাকা ভাগাভাগি করার বিষয়ে ভুক্তভোগীর স্বীকারোক্তির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।

এ ঘটনায় একদিকে নিহতের পরিবার সামাজিক সংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে স্থানীয়দের একটি বৃহৎ অংশ ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের দাবি, সিজানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদকসেবন ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ছিল।

স্থানীয় মাসদাইর আল ফালাহ কল্যাণ সংগঠনের সহ-সভাপতি ও স্থানীয় মসজিদের ইমাম মুফতি কাউসার কাসেমি মোবাইলফোনে বলেন, ‘সিজানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও নানা অপকর্মের অভিযোগ ছিল। এসব বিষয়ে তাকে তিন থেকে চারবার সতর্ক করা হয়েছিল। এমনকি তাকে সংশোধনের লক্ষ্যে ৪০ দিনের চিল্লায়ও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ফিরে এসে সে আবারো একই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে।’

তিনি দাবি করেন, ঘটনার দুই দিন আগে ইমন নামে এক যুবককে নগরীর চাষাড়া তুলে এনে সারারাত মারধর নির্যাতন শেষে থেকে একটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়া হয়। পরে সেই মোবাইল বিক্রি করে টাকার ভাগাভাগি করে নেয় সিজান ও তার সহযোগীরা। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শনিবার তাকে বাসা থেকে ডেকে আনা হয়।’

কাওসার আহমেদের আরো বলেন, মসজিদের সামনে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার সময় কিছু স্থানীয় ব্যক্তি তাকে মারধর করেন। মাগরিবের নামাজের সময় তিনি ও অন্য মুসল্লিরা নামাজে চলে গেলে সেখানে উপস্থিত কয়েকজন আবারো তাকে মারধর করেন।

মাগরিব নামাজের পর একটি মুচলেকা নিয়ে সিজানকে তার মায়ের জিম্মায় সুস্থ অবস্থায় বুঝিয়ে দেয়া হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন।

এদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সিজান ও তার বাহিনী কর্তৃক ইমন নামে যুবকের মোবাইল ছিনতাইয়ের পর তা বিক্রি করে টাকা আদায়ের স্বীকারোক্তি যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, সিজান বাহিনীর প্রধান সিজান ও তার সহযোগীরা কিভাবে ইমন নামে এক যুবকের মোবাইল ছিনতাই শেষে তা বিক্রি করে ভাগাভাগি করেছে ভুক্তভোগী এমন সেই স্বীকারোক্তি দিয়েছে।

ভুক্তভোগী ইমন বলেন, সিজান মোবাইল ক্রয় করবে একথা বলে নগরীর চাষাড়া থেকে তাকে তুলে নিয়ে আসে এবং সারারাত নির্যাতন করে মোবাইল রেখে দেয়। পরের দিন তার সহযোগীরা মোবাইলটি বিক্রি করে টাকা ভাগাভাগি করে নেয়।

এ সময় ইমন তাকে মারধর করা শরীরে বিভিন্ন আঘাতের চিহ্ন দেখায়। ভুক্তভোগী ইমনের এই স্বীকারোক্তির ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

এদিকে, সিজানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে তার বড় ভাই বাবুর নেতৃত্বে সিজান বাহিনী ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ২৫-৩০ জনের বাহিনী দেশীয় অস্ত্র নিয়ে এলাকায় ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। তারা ১৫ থেকে ২০টি দোকানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এ সময় দোকানের ফ্রিজ, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন মূল্যবান মালামাল ভাঙচুর করা হয়। তাণ্ডবের ভিডিও-ও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

নিহত সিজানের বাবা ইন্নু মিয়া সংশ্লিষ্ট ঘটনায় অভিযোগ করে বলেন, এলাকার একটি মসজিদের ইমাম কাওসার আহমেদের নেতৃত্বে সম্প্রতি গঠিত ‘আল ফালাহ কল্যাণ সংগঠন’র ৩০ থেকে ৪০ জন সদস্য শনিবার রাতে সিজানকে তার বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যান। পরে তাকে নির্মমভাবে মারধর ও নির্যাতন করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলে স্বজনরা দ্রুত নারায়ণগঞ্জের খানপুর ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ফতুল্লা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহবুব আলম বলেন, গণপিটুনির ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডবের খবর আমরা পেয়েছি। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

তিনি আরো জানান, নিহতের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। নিহত যুবক বিভিন্ন অপকর্ম ও ছিনতাইয়ের সাথে জড়িত ছিল। তার বিরুদ্ধে ফতুল্লা থানায় মারামারির একটি মামলা রয়েছে। তবে বিষয়টি তদন্তাধীন এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।