চান্দিনায় গৃহকর্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা, ৩ সপ্তাহেও রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ

রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে লোকমুখে জানতে পারেন, তার স্ত্রীকে কে বা কারা পিটিয়ে আহত করেছে। খবর পেয়ে দ্রুত বাড়িতে ফিরে তিনি দেখতে পান, তার স্ত্রীর মাথা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে এবং তিনি অচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন।

জাকির হোসেন, চান্দিনা (কুমিল্লা)

Location :

Chandina
নিহত গৃহকর্ত্রী বীনা রাণী রায়
নিহত গৃহকর্ত্রী বীনা রাণী রায় |নয়া দিগন্ত

কুমিল্লার চান্দিনায় নিজ বসতঘরে ঢুকে বীনা রাণী রায় (৫৮) নামে এক গৃহকর্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় প্রায় তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। কারা, কী কারণে ও কী উদ্দেশ্যে ওই নারীকে হত্যা করেছে এখনো তার কোনো কূলকিনারা হয়নি। অজ্ঞাত পরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় হতাশা বাড়ছে নিহতের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে।

গত ১৭ আগস্ট সন্ধ্যার পর উপজেলার বরকইট গ্রামের নিজ বসতঘরে ধর্মীয় আচার হিসেবে মালা জপ করছিলেন বীনা রাণী রায়। ওই সময় অজ্ঞাত ব্যক্তিরা ঘরে প্রবেশ করে তাকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে চান্দিনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহতের স্বামী দিলীপ কুমার রায় জানান, তিনি ডাকঘরে চাকরি করতেন এবং বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। তাদের তিন ছেলে দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মরত থাকায় বাড়িতে শুধু স্বামী-স্ত্রী দু’জনই বসবাস করতেন। ঘটনার দিন রাত পৌনে ৮টার দিকে তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে স্থানীয় একটি চায়ের দোকানে যান। এ সময় তার স্ত্রী ঘরে বসে মালা জপ করছিলেন।

তিনি জানান, রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে লোকমুখে জানতে পারেন, তার স্ত্রীকে কে বা কারা পিটিয়ে আহত করেছে। খবর পেয়ে দ্রুত বাড়িতে ফিরে তিনি দেখতে পান, তার স্ত্রীর মাথা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে এবং তিনি অচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন।

দিলীপ কুমার রায় বলেন, আমি বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আমার স্ত্রী ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছিল। সাধারণত পরিচিত ব্যক্তি ছাড়া রাতে সে দরজা খুলত না। কিন্তু হামলার পর ঘরের দরজা স্বাভাবিকভাবেই খোলা ছিল। দরজা বা অন্য কোথাও ভাঙচুরের চিহ্নও পাওয়া যায়নি। এ কারণে আমার ধারণা, পরিচিত কেউই তাকে হত্যা করেছে।

Comilla-Murder-Home
নিহতের বাড়ি (ঘটনাস্থল) | নয়া দিগন্ত

নিহতের কনিষ্ঠ ছেলে তাপস কুমার রায় বলেন, কারা এবং কেন আমার মাকে হত্যা করেছে, সে বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। এ কারণে অজ্ঞাত পরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে থানায় হত্যা মামলা করেছি। কিন্তু প্রায় তিন সপ্তাহ হয়ে গেলেও এখনো মায়ের হত্যার রহস্য জানতে পারিনি। আদৌ জানতে পারব কি-না, সেটাও বুঝতে পারছি না।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার সাথে কথা বলে জানা গেছে, বরকইট গ্রামের ওই এলাকায় অল্পসংখ্যক হিন্দু পরিবারের বসবাস। তাদের ভাষ্য, বীনা রাণী রায়ের পরিবার অত্যন্ত নিরীহ ও শান্তিপ্রিয়। সন্ধ্যার পর নিজ ঘরে ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকা একজন নারীকে এভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা এলাকায় উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। দ্রুত হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এদিকে বীনা রাণী রায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের কুমিল্লা জেলা ও চান্দিনা উপজেলা শাখার নেতৃবৃন্দ। তারা হত্যাকাণ্ডের রহস্য দ্রুত উদ্ঘাটন ও জড়িতদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন।

কুমিল্লা জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নারায়ণ চন্দ্র সরকার বলেন, একজন হিন্দু নারীকে ঘরে ঢুকে অতর্কিতভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করতে না পারা এবং হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে ব্যর্থ হওয়া প্রশাসনের জন্য অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। আমরা এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাই। অনতিবিলম্বে প্রকৃত হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছি।

নিহতের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘটনার প্রায় তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় তারা হতাশ হয়ে পড়েছেন। তাদের দাবি, হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত কি-না, হামলাকারীরা কিভাবে ঘরে প্রবেশ করল, হত্যার পেছনে কোনো পূর্বশত্রুতা বা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি-না, এসব বিষয় গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করা হোক।

এ বিষয়ে চান্দিনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: নুরুজ্জামান জানান, এ ঘটনা নিয়ে আমরা কাজ করছি, মামলাটি তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে বিস্তারিত কিছুই বলা যাচ্ছে না।