ময়মনসিংহের ত্রিশালে কৃষিজমি দখল করে পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা তৈরির অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার দু’টি এলাকায় গড়ে ওঠা এসব অবৈধ কারখানায় দিনের বেলায় পুরোনো ব্যাটারি ভেঙে অ্যাসিড, সিসা ও প্লাস্টিক আলাদা করা হচ্ছে। আর রাত নামলেই মাটির গর্তে এসব উপাদান পোড়ানো হয়। এতে ছড়িয়ে পড়ছে তীব্র ঝাঁঝালো ধোঁয়া ও বিষাক্ত রাসায়নিক। দূষিত হচ্ছে মাটি, পানি ও বায়ু। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিজমি ও ফসল। মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন আশপাশের মানুষ।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের নিঘোরকান্দা এলাকায় একটি ইটভাটার পাশে কৃষিজমি ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে সিসা তৈরির কারখানা। সেখানে পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহ করে শ্রমিকরা সেগুলো ভেঙে সিসা ও অন্য উপাদান আলাদা করছেন।
একইভাবে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক সংলগ্ন বৈলর ইউনিয়নের নামাপাড়া এলাকার ৬ নম্বর ওয়ার্ডেও চলছে পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা তৈরির কাজ। দু’টি কারখানায় প্রায় অর্ধশত শ্রমিক কাজ করেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় কোনো ধরনের সরকারি অনুমোদন ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে এ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে কারখানা দু’টির মালিকপক্ষ। প্রশাসনের নাকের ডগায় কৃষিজমিতে এমন পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রম চললেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে এলাকাবাসীর মধ্যে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, দিনের বেলায় ব্যাটারি ভেঙে অ্যাসিড, সিসা ও প্লাস্টিক আলাদা করা হয়। পরে রাতের আঁধারে এসব উপাদান পোড়ানো হয়। এ সময় চারপাশে তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। বিষাক্ত ধোঁয়া ও কারখানার বর্জ্য আশপাশের কৃষিজমিতে পড়ায় ধানসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ কৃষকদের।
বৈলর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ছাইফুল ইসলাম ফরাজী বলেন, ‘কয়েক মাস আগে কৃষিজমিতে পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা তৈরির কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। দিনে পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহ করা হয় এবং সারা রাত সেগুলো পোড়ানো হয়। এতে এলাকায় অসহনীয় ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।’
তিনি কয়েকবার কারখানা কর্তৃপক্ষকে নিষেধ করেছেন বলেও জানান।
তবে কারখানার ম্যানেজার আবুল কালাম বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘এটি বৈধ নয়। অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের চেষ্টা করছি। এখনো অনুমোদন পাইনি।’
অবশ্য পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, এতে কোনো ক্ষতি হয় না। একই সাথে তিনি বলেন, ‘প্রশাসন ও এলাকার সবাইকে ম্যানেজ করেই এই ব্যবসা করতে হয়।’
বৈলর ইউনিয়নের কারখানার মালিক বিল্লালকে কারখানার বৈধ কাগজপত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভাই, এটা নিয়ে নিউজ করতে হবে না।’
পরে বৈধ কাগজপত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা তো কৃষিজমিতে সরকার অনুমোদন দেয় না।’
এ বিষয়ে পরে সন্ধ্যায় কথা বলার প্রস্তাব দেন তিনি।
হরিরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক শামসুজ্জামান মাসুম বলেন, ‘সিসা কারখানার বিষয়টি তাদের জানা ছিল না। কারখানাটি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কোনো ট্রেড লাইসেন্স নেয়নি।’
বিষয়টি নিয়ে এলাকার কৃষকেরাও ক্ষুব্ধ বলে জানান তিনি।
ত্রিশাল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাম্মিম জাহান বলেন, ‘কৃষিজমিতে সিসা ও অ্যাসিড পোড়ানো কিংবা ফেলার ফলে ফসলের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়। এতে মাটির উর্বরতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদিত ফসল মানুষের খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে।’
ত্রিশাল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছি। ওই অবৈধ কারখানা বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
পরিবেশ অধিদফতর, ময়মনসিংহ বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক শেখ মো: নাজমুল হুদা বলেন, ‘সিসা তৈরির কারখানা দু’টি অবৈধ। এগুলোর কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। কারখানা দু’টি বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’



