শখের চাষে সাফল্যের গল্প, বাড়ির পাশেই ৩২ জাতের আমের বাগান

সারি সারি আমগাছ ঘিরে যেন এক মনোরম পরিবেশ। প্রতিটি গাছেই ঝুলছে থোকায় থোকায় আম। কোথাও লালচে, কোথাও হলুদ কিংবা সবুজ রঙের বাহারি আম।

মোছাদ্দেক হোসাইন, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম)

Location :

Lohagara
সারি সারি আমগাছ
সারি সারি আমগাছ |নয়া দিগন্ত

কয়েক বছর আগেও বাড়ির পাশের জমিটি ছিল একেবারেই পরিত্যক্ত। পাহাড়ি ঢালু হওয়ায় সেখানে কোনো ধরনের আবাদ সম্ভব হতো না। বর্ষায় ঝোপঝাড়ে ঢেকে যেত জায়গাটি, আর বছরের বাকি সময় পড়ে থাকত অনাবাদি। সেই জমিকেই নিজের শখ আর আগ্রহ দিয়ে এক অনন্য আমবাগানে রূপ দিয়েছেন চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার বাসিন্দা ফরিদুল আলম (৪৮)। এক বাগানেই দেশী-বিদেশি মিলিয়ে ৩২ জাতের প্রায় ৩০০টি আমগাছ লাগিয়ে তিনি এখন স্থানীয়দের কাছে হয়ে উঠেছেন অনুকরণীয় এক উদ্যোক্তা।

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের মিরিখীল মৌলভীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ফরিদুল আলম পেশায় একজন ব্যবসায়ী। ২০২৩ সালের জুন মাসে বাড়ির পাশের প্রায় এক একর পরিত্যক্ত জমিতে ৩২ জাতের আমের চারা রোপণ করেন তিনি। মাত্র তিন বছরের মাথায় সেই গাছগুলো ফল দিতে শুরু করেছে। চলতি মৌসুমে তিনি প্রায় দেড় হাজার কেজি আম সংগ্রহ করেছেন। আগামী বছর ফলন কয়েক গুণ বাড়বে বলে আশাবাদী তিনি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি আমগাছ ঘিরে যেন এক মনোরম পরিবেশ। প্রতিটি গাছেই ঝুলছে থোকায় থোকায় আম। কোথাও লালচে, কোথাও হলুদ কিংবা সবুজ রঙের বাহারি আম। কোনোটি লম্বাটে, কোনোটি গোলাকার। বিভিন্ন জাতের আমে ভরে উঠেছে পুরো বাগান। ফলের ভারে অনেক গাছের ডাল নুয়ে পড়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই ব্যতিক্রমী বাগান দেখতে আসছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাগানটিতে রয়েছে বারি আম-৪, হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালি, হাঁড়িভাঙা, গোপালভোগ, কাটিমন, মিয়াজাকি, রাঙ্গুয়াই, আশ্বিনা, মল্লিকা, তোতাপুরি, গৌড়মতি, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, রেড পালমার, ব্রুনাই কিং, রেড আইভরিসহ দেশী-বিদেশি ৩২ জাতের আমগাছ। প্রায় ১০ থেকে ১৫ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে গাছগুলো রোপণ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিটি গাছের উচ্চতা প্রায় চার থেকে ছয় ফুট। অধিকাংশ গাছেই এবার ভালো ফল এসেছে। একেকটি আমের ওজন ২০০ গ্রাম থেকে প্রায় এক কেজি পর্যন্ত।

বাগানে আম সংগ্রহের ব্যস্ততার মধ্যেই কথা হয় ফরিদুল আলমের সাথে। তিনি বলেন, ‘শখের বশেই ভেবেছিলাম দেশী-বিদেশি বিভিন্ন জাতের একটি আমবাগান করব। উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের সহযোগিতায় গাজীপুর কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের নার্সারি থেকে চারা সংগ্রহ করি। গত বছর অল্প কিছু গাছে আম ধরেছিল। এবার প্রায় দেড় টন আম পেয়েছি। এসব আম স্বজন, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের উপহার দিয়েছি। আগামী বছর আরো বেশি ফলন হবে বলে আশা করছি।’

তিনি জানান, পরিবারের সদস্যরাও বাগানের পরিচর্যায় নিয়মিত সহযোগিতা করেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেকেই এই বাগান দেখতে আসেন। নানা জাতের আম একসাথে দেখে অনেকেই বিস্মিত হন এবং নিজের বাড়ির আশপাশে এমন বাগান গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শও দিয়ে থাকেন তিনি।

ফরিদুল আলম বলেন, ‘শুরুতে এটি ছিল শুধুই শখের উদ্যোগ। এখন এটি আমাকে মানসিক প্রশান্তি দেয়ার পাশাপাশি অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করছে। ভবিষ্যতে আরো নতুন জাতের আম সংযোজন করে বাগানটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।’

লোহাগাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাজী শফিউল ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের বহুজাতের আমবাগান এলাকায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে। আমবাগানে সঙ্গী ফসল হিসেবে বিভিন্ন অর্থকরী ফসল চাষের সুযোগ রয়েছে। এতে কৃষকের আয় আরো বাড়তে পারে। উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের পক্ষ থেকে নতুন উদ্যোক্তাদের নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারাও মাঠপর্যায়ে সার্বক্ষণিক পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।’

স্থানীয়দের মতে, শখ থেকে শুরু হওয়া ফরিদুল আলমের এই উদ্যোগ এখন শুধু একটি আমবাগান নয়, বরং এলাকার অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার নাম। অব্যবহৃত জমিকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিতভাবে ফলচাষ করলে যে সফল হওয়া সম্ভব, তার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছে তার ৩২ জাতের আমের এই ব্যতিক্রমী বাগান।

Topics