ময়মনসিংহে পাঁচ মাসে ৫৫ খুন : জমি নিয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড, জুলাইয়ে ১৬

ময়মনসিংহে যেন থামছেই না হত্যাকাণ্ড। জমি নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক কলহ, পাওনা টাকা, পরকীয়া কিংবা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একের পর এক প্রাণহানি ঘটছে।

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম, ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহ জেলা ম্যাপ
ময়মনসিংহ জেলা ম্যাপ |নয়া দিগন্ত

ময়মনসিংহে যেন থামছেই না হত্যাকাণ্ড। জমি নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক কলহ, পাওনা টাকা, পরকীয়া কিংবা তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একের পর এক প্রাণহানি ঘটছে।

জেলা পুলিশের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই—মাত্র পাঁচ মাসে ময়মনসিংহ জেলায় ৫৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসেই খুন হয়েছেন ১৬ জন।

চলতি আগস্ট মাসেও একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সর্বশেষ গত ১৩ আগস্ট দুপুরে নগরীর মাসকান্দা এলাকায় আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সামনে প্রকাশ্যে খুন হন রাব্বী (২৭) নামে এক যুবক। এ ঘটনায় আটক আব্দুল খালেক (২৬) পুলিশের কাছে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের কথা স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।

এর আগে গত ৫ আগস্ট ফুলবাড়িয়ার এনায়েতপুর ইউনিয়নে আবু রায়হান (৪০) নামে এক ব্যক্তির ১৫ টুকরো লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি কাস্টমসের সিপাহি ছিলেন। নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

জমির বিরোধে রক্তপাত

পুলিশ ও মামলা সূত্রে জানা গেছে, ময়মনসিংহে হত্যাকাণ্ডের বড় একটি অংশের নেপথ্যে রয়েছে জমিজমা নিয়ে বিরোধ। দীর্ঘদিনের বিরোধ, সীমানা নির্ধারণ, জমির দখল এবং সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারাকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা এবং শেষ পর্যন্ত হত্যার ঘটনা ঘটছে।

গত ১১ জুলাই ফুলপুর উপজেলার ধীতপুর গ্রামে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে ইউসুফ আলী (৭৪) নিহত হন। এর আগে ১ জুন সদর উপজেলার পরানগঞ্জ ইউনিয়নে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে ছোট ভাইয়ের লাঠির আঘাতে নিহত হন আব্দুল বাছেদ (৩৫)।

এ ছাড়া গত ২৯ এপ্রিল ফুলপুরে জমি লিখে না দেয়াকে কেন্দ্র করে আয়েশা খাতুন নামে এক বৃদ্ধাকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে।

জুলাই যেন ছিল রক্তাক্ত মাস

জুলাই মাসের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো ছিল বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। গত ৫ জুলাই গৌরীপুর উপজেলার ভাংনামারী ইউনিয়নে বাড়ি ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হন আব্দুল বারেক আকন্দ (৫৫)।

১১ জুলাই তারাকান্দার রোয়াপাড়া গ্রামে জমির আইল থেকে উদ্ধার করা হয় আড়াই বছরের এক শিশুর লাশ। একই দিন ফুলপুরে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে ইউসুফ আলী নিহত হন।

১২ জুলাই তারাকান্দার মাধবপুর গ্রামে ভাতিজা আলামিনের ছুরিকাঘাতে নিহত হন আক্রাম মিয়া (৫৫)। পরদিন আলামিনের বাড়িতে হামলার ঘটনায় আহত তার মা নূরজাহান চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

১৮ জুলাই মধ্যরাতে সদর উপজেলার চরঈশ্বরদিয়া এলাকায় অটোরিকশাচালক রাজীব মিয়া (২৫)-কে হত্যা করে তার অটোরিকশা নিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। একই রাতে গৌরীপুরের মইলাকান্দা ইউনিয়নের ডেঙ্গার মোড়সংলগ্ন এলাকায় ছুরিকাঘাতে নিহত হন আব্দুল মান্নান ওরফে মন্নাফ (৬৫)।

তুচ্ছ বিরোধেও ঝরছে প্রাণ

শুধু জমি নয়, সামান্য টাকা কিংবা পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিরোধও ময়মনসিংহে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের কারণ হয়ে উঠছে।

গত ২৩ মে মুক্তাগাছার রসুলপুরে মাত্র ৩ হাজার টাকা পাওনাকে কেন্দ্র করে শফিকুল ইসলাম নামে এক যুবককে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ ওঠে। ১৪ এপ্রিল ফুলবাড়িয়ায় মাত্র ১০ টাকার বিরোধে ভাতিজার ছুরিকাঘাতে আয়েশা খাতুন নামে এক নারী নিহত হন।

গফরগাঁওয়ের পাগলা থানা এলাকায় গত ২০ মে গাছে বাঁধা অবস্থায় এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে পরকীয়ার জেরে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে বলে জানা যায়। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেফতার করা হয়।

এ ছাড়া গত ৪ মে ধোবাউড়ার দীঘিরপাড় এলাকায় দুলাল খাঁ নামে এক ব্যক্তির গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মুক্তাগাছায় নিখোঁজের পর শিশু সাদমান রাফির লাশ উদ্ধার করা হয় ১০ মে। তার অপহরণকারীরা মুক্তিপণও দাবি করেছিল।

গত ৭ জুন রাতে গফরগাঁও উপজেলা সদরের মাজার রোডে দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত হন কলেজছাত্র নাহিয়ান রবিন (২৪)। ২ জুন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের চরঈশ্বরদিয়া এলাকায় প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে নিহত হন রানা মিয়া (৩৩) নামে এক ব্যক্তি।

৯০ শতাংশ ঘটনায় গ্রেফতার দাবি পুলিশের

জেলা পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে তারা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। পুলিশের দেয়া তথ্যমতে, প্রায় ৯০ শতাংশ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, জমিসংক্রান্ত ও পারিবারিক বিরোধের মতো বিষয়গুলোতে সতর্ক থাকতে থানাগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। চিহ্নিত অপরাধীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

তবে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে—বিরোধ যখন ছোট, তখনই কেন তা মীমাংসা হচ্ছে না? জমি, টাকা কিংবা পারিবারিক কলহের মতো বিষয় কীভাবে শেষ পর্যন্ত হত্যার মতো ভয়াবহ পরিণতিতে পৌঁছাচ্ছে, সেটিই এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।

পুলিশ বলছে, অপরাধীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে; কিন্তু হত্যাকাণ্ডের আগেই বিরোধ শনাক্ত করে তা ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ কতটা নেয়া হচ্ছে—সেই প্রশ্নই এখন সামনে।