হিমাগারে আলু সংরক্ষণ ভাড়া কমানোর দাবিতে রংপুর-কুড়িগ্রাম আঞ্চলিক মহাসড়কে গাছের গুঁড়ি ও আলু ফেলে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছেন রংপুরের আলু চাষী ও ব্যবসায়ীরা।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত মহাসড়কের নবীগঞ্জে অপু মুন্সি হিমাগারের সামনে এই অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন তারা।
এ সময় রংপুরের আলু চাষী ও ব্যবসায়ীরা ঘোষণা দেন, শনিবারের (২৯ আগস্ট) মধ্যে হিমাগারে প্রতি কেজি আলুর সংরক্ষণ ভাড়া পাঁচ টাকা ২০ পয়সা করা না হলে রোববার (৩০ আগস্ট) থেকে নিজ দায়িত্বে পাঁচ টাকা ২০ পয়সা জমা দিয়ে আলু উত্তোলন করবেন তারা।
অবরোধ পালনকালে হিমাগার অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবুকে শেখ হাসিনার পোষ্যপুত্র হিসেবে বিদেশে সফরসঙ্গি ও আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যায়িত করে তাকে অপসারণ ও গ্রেফতারের দাবি জানান তারা। পরে তারা বাবু চৌধুরীর কুশপুত্তলিকায় জুতা নিক্ষেপ ও আগুন ধরিয়ে দেন।

তবে হিমাগার অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু জানান, সরকারের নির্দেশনা মেনেই মূল্য নিচ্ছেন তারা।
অবরোধে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের সাথে রংপুরের উপর দিয়ে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ এক ঘণ্টা বন্ধ ছিল। এ সময় বিপুল সংখ্যক গাড়ি রাস্তার দুই পাশে আটকা পড়ে। ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন যাত্রীরা।
অবরোধকারীরা রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ও আলু ফেলে দিয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সময় বিক্ষোভকারী কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরীর ছবি ও কুশপুত্তলিকায় জুতা নিক্ষেপ এবং আগুন ধরিয়ে দিয়ে বিক্ষোভ করেন তারা। অনেককেই থুথু দিতেও দেখা যায়।
অবরোধে অংশ নেয়া লালমনিরহাটের রাজপুর ইউনিয়নের কৃষক মোহাম্মদ সাজিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি একজন সাধারণ কৃষক। আমি স্টোরে ২৫০ বস্তা আলু রেখেছি। আমরা যখন এই আবাদ করতে যাই, আমাদের ২৫ শতক জমির লিজ দিতে হয় ১০ হাজার টাকা, সার-কীটনাশক কিনতে হয় আট-নয় হাজার টাকা। এখন বীজ কেনা লাগে ১০ হাজার টাকার। শ্রমিক, পানি, সেচ সার দিতে অনেক খরচ হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘বস্তা বহন করে স্টোরে প্রবেশ করানো পর্যন্ত খরচ হয় ২২-২৩ টাকা প্রতি কেজি। এখন ভাড়া নিচ্ছে সাত-সাড়ে সাত টাকা। আলুর গায়ে পরে যায় ৩০ টাকা। বাজারে বিক্রি করছি ১৪ টাকা। আমরা কৃষক কিভাবে বাঁচব? আমরা কোথায় যাব? আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। আমরা কি উপায় পাব? আমরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। আমাদের এখন বাড়ি-ঘর বিক্রি করে সেই ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে ফেসবুকে দেখে আন্দোলনে নেমেছি।’
কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর থেকে অবরোধে অংশ নেয়া কৃষক মুসলিম উদ্দিন বলেন, ‘আমি স্টোরে দুই হাজার বস্তা আলু রেখেছি। হিমাগার মালিকরা আমাদের কাছে নিচ্ছে সাত টাকা। উনাদের ইচ্ছামতো উনারা ভাড়া নিচ্ছে। আমরা কোনো কিছু আন্দোলন করলে ওরা উপর থেকে চাপ দিয়ে আমাদের আন্দোলন ধূলিসাৎ করে দেয়। আমরা এবারকার আন্দোলনে নামছি, হয় জীবন দেবো আর নয়তো ভাড়া পাঁচ টাকা করব।’
তিনি আরো বলেন, ‘ওরা যেহেতু শিল্পপতি, ওদের অনেক টাকার দরকার। বিদেশে বাড়ি করতে হবে। তারপরও আমরা আড়াই টাকার জায়গায় পাঁচ টাকা দিতে চাইছি, তবুও উনারা রাজি না। উনারা সাত টাকাই নিবে। এইজন্যই আমাদের আন্দোলন। আজকের আন্দোলনে দাবি না মানলে আমরা আরো কঠিন, এর চেয়ে আরো কঠিন সিদ্ধান্ত নেব। প্রয়োজনবোধে সারা বাংলাদেশ অচল করে দেবো।’
অবরোধে অংশ নেয়া পীরগাছার কল্যাণী ইউনিয়নের আব্দুল মান্নান বলেন, ‘সারা বাংলাদেশে ৪০০ কোল্ড স্টোরের মধ্যে আমাদের রংপুর অঞ্চলে আছে ৩৯টা। বাবু চৌধুরী সভাপতি হওয়ার কারণে রংপুরে ভাড়া নেয়া হচ্ছে ৬৫ কেজির বস্তা ৪৩৫ টাকা। বাংলাদেশের অন্যান্য সব কোল্ড স্টোরে ৩২০-৩৩০ টাকা ভাড়া আদায় করতেছে। শুধু এই বাবু চৌধুরীর কারণে আমরা ভাড়াটা কমাইতে পারতেছি না। যদি আমাদের ভাড়া পাঁচ টাকা ২০ পয়সা করা না হয়, আমরা সব কোল্ড স্টোরে তালা লাগায়ে দেবো।’
আন্দোলনে অংশ নেয়া রংপুর জেলার আলু চাষী ও ব্যবসায়ী সমিতির কার্যকরী সদস্য রাসেল মিয়া বলেন, ‘মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবুর হাত এত শক্তিশালী, প্রচুর পরিমাণে অর্থ ব্যয় করে সরকারের সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাইতেছে। সরকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ও কিভাবে এখনো সাত টাকা ভাড়া নেয়, এইটা সরকারকে জানানোর জন্য আমরা এখানে দাঁড়াইছি। বাবু চৌধুরীর নির্দেশে সাত থেকে সাড়ে সাত টাকা ভাড়া নেয়া হচ্ছে। তা আমরা তাকেই তো দায়ী করব। সে আওয়ামী লীগের দোসর, সাবেক ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রীর সাথে সফরসঙ্গী ছিল। আমরা ওর পদত্যাগ দাবি করতেছি এবং রংপুরে তাকে আমরা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করলাম।‘
তিনি আরো অভিযোগ করেন, ‘মোস্তফা আজাদ চৌধুরী যখন কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হয়েছেন, এরপর থেকেই ভাড়া বাড়ছে। বিগত সময়ে স্টোর চালু হওয়ার আগে কৃষক সমাবেশ করে কোল্ড স্টোরের মালিকরা স্টোর ভাড়া নির্ধারণ করত। কিন্তু বাবু চৌধুরী সভাপতি হওয়ার পর ফ্যাসিস্ট আমলে উনি কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে খেয়াল-খুশিমতো কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের দোহাই দিয়ে, কৃষি বিপণনের দোহাই দিয়ে মনগড়া ভাড়া নির্ধারণ করেন। কৃষক তো অসহায়! কৃষক আলু ঢোকানোর পরে যখন বাড়তি ভাড়া হাকতো, তখন করার কিছুই ছিল না। আন্দোলনও করতে দেয় নাই তিনি। সেই ২০২০ সাল থেকে তিনি ভাড়া বাড়াচ্ছেন। আজ ২০২৬ সালে আমরা মাঠে নেমেছি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ফিরব না।’
রংপুর আলু চাষী ও ব্যবসায়ী আন্দোলন কমিটির সদস্য সচিব রংপুর মোবারক হোসেন মনসুর বলেন, ‘সারাদেশে সরকার ডিসি অফিসের মাধ্যমে যে কমিটি করেছে, তাতে ২৫ জেলার মধ্যে ৩৫০টা কোল্ড স্টোরে সমীক্ষা চালিয়ে গড়ে সর্বোচ্চ পাঁচ টাকা ২০ পয়সা প্রতি কেজি স্টোর ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু স্টোর মালিকরা নিতেছে সাত টাকা ২৫ পয়সা। এটা একটা সিন্ডিকেট, স্টোর মালিকদের সিন্ডিকেট।’
তিনি বলেন, ‘এই সিন্ডিকেটের সাথে কৃষি বিপণনের কিছু কর্মকর্তা জড়িত। পাশাপাশি স্টোর মালিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবুও জড়িত। তিনি ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে শেখ হাসিনার পোষ্যপুত্র হিসেবে বিদেশ সফরের সঙ্গী ছিলেন। উনার মদদে রংপুরকে অস্থিতিশীল করার জন্য, গোটা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য উনি ভাড়া কমাচ্ছেন না। তিনি সরকারের সিদ্ধান্ত মানছেন না। এ কারণে দ্রুত তাকে অপসারণ করে গ্রেফতার করা হোক।‘
তিনি আরো বলেন, ‘রংপুরে এক কেজি আলু উৎপাদন করতে ১৮ টাকা খরচ হয়, বস্তা ও স্টোর পর্যন্ত আনা মিলিয়ে খরচ পড়ে ২২ টাকা। সাত টাকা যদি ভাড়া নেয় তাহলে খরচ হয় ২৯ টাকা। স্টোরে আমরা আলু রাখি ৬৫ কেজি, কিন্তু আলু পাই ৬০ কেজির নিচে। এই যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি, এখন মাঠে বিক্রি করছি ১৪ টাকা। এই ক্ষতিগ্রস্ততার দায় কে নিবে? আমরা মনে করি বাবু চৌধুরীকেই এই দায় নিতে হবে।’
রংপুর আলু চাষী ও ব্যবসায়ী আন্দোলন কমিটির আহ্বায়ক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের রংপুরে প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন আলু এখানে সংরক্ষণ আছে। কিন্তু কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু, যেখানে ভাড়া নেয়ার কথা তিন-চার টাকা, সেখানে তিনি নিতেছেন সাত থেকে সাড়ে সাত টাকা (কেজি প্রতি)।’
তিনি বলেন, ‘আমরা একটা গড় হিসাব করে দেখেছি, শুধু এই অঞ্চলের কৃষকের কাছ থেকেই তিনি প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা লুট করে নিয়ে যাচ্ছেন প্রতি বছর। সরকার কি এই বিষয়ে অবগত আছে? সরকারের মুখেই শুনি, সব জায়গায় শুনি সিন্ডিকেট, আসলে সিন্ডিকেটটা কোথায়? এই সিন্ডিকেটটা তো ভাঙতে হবে! সিন্ডিকেট না ভাঙলে তাহলে কৃষকের কোনো উপকারে আসবে না।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘মোস্তফা আজাদ চৌধুরী হলেন আওয়ামী লীগের দোসর। তিনি আওয়ামী লীগের আমলে শেখ হাসিনার পোষ্যপুত্র হিসেবে বিদেশ ঘুড়েছেন। হাসিনার সমস্ত অপকর্মকে বৈধতা দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের আমলে আমাদেরকে তিনি রাস্তায় দাঁড়াইতে দেন নাই, মামলা-হামলা করে আমাদেরকে বাড়িছাড়া পর্যন্ত করছেন। এই মোস্তফা আজাদ চৌধুরী ২৪-পরবর্তী আন্দোলনের পর এখনো কিভাবে কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি থাকেন।’
তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বারবার তাকে গ্রেফতারের দাবি জানাইছি। অথচ এইখানে সরকার তার বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশন নেয় নাই। তাহলে কি আমরা বুঝব না যে, এই সরকারের মধ্যে আওয়ামী লীগের কোনো দোসর আছে? বাবু চৌধুরী রংপুরকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সরকার বলে দেয়ার পরও দাম কমাচ্ছে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা সরকারকে সতর্ক করার জন্য অনতিবিলম্বে আমাদের এই দাবিটা দ্রুত মেনে নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আর যদি মেনে না নেয়, তাহলে রোববার (৩০ আগস্ট) থেকে আমরা আমাদের নির্ধারিত পাঁচ টাকা ২০ পয়সা হারে প্রদান করে নিজেরাই আলু স্টোর থেকে বের করে নিয়ে যাব। যদি এতে অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা ঘটে, তাহলে এর জন্য সরকার-প্রশাসন দায়ী থাকবে।’
জানা যায়, সরকার আলুর সংরক্ষণমূল্য নির্ধারণের জন্য প্রতিটি ডিসি অফিসের মাধ্যমে একটি কমিটি করে। এলাকাভেদে কী পরিমাণ খরচ হয় এবং তার ওপর লাভ ধরে কমিটি কেজি প্রতি আলুর সংরক্ষণ ভাড়া নির্ধারণ করে পাঁচ টাকা ২০ পয়সা। রংপুরের এই কমিটিতে সবাই স্বাক্ষর করলেও হিমাগার আসোসিয়েশন সই করেনি। বরং তারা সাত থেকে সাত টাকা ৩০ পয়সা পর্যন্ত ভাড়া নির্ধারণ করেছে। এ নিয়ে জুন মাস থেকেই বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম করছেন চাষী ও ব্যবসায়ীরা।
অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ হিমাগার অ্যাসোসিয়েশন মালিক সমিতির সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, ‘কৃষি মন্ত্রণালয়ের বেধে দেয়া প্রতি কেজি ছয় টাকা ৭৫ পয়সার বদলে আমরা ছয় টাকা ৩২ পয়সা করে সংরক্ষণমূল্য নিচ্ছি। এখানে কোনো সিন্ডিকেট নেই। আমরা সরকারের কাছে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে উপস্থাপন করে ভাড়া বাড়ানোর দাবি করেছি। যারা এসব আন্দোলন করছে, মব তৈরির চেষ্টা করছে, তাদেরকে আইনের আওতায় আনা উচিত।’



