জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেছেন, ‘দেড় বছর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করল। তখন তো রাজনৈতিক সরকার ছিল না এবং তাদের পেছনে রাজনৈতিক ব্যাকআপও ছিল না। এ সময়ে আমরা এতো সঙ্কট দেখিনি। কিন্তু আমরা দেখছি, বিএনপি একটার পর একটা সঙ্কট তৈরি করে যাচ্ছে। গ্যাসের সঙ্কট, তীব্র লোডশেডিং, কৃষক ঠিকমতো সার পাচ্ছেন না, প্রত্যেকটা জায়গায় দলীয়করণ করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করার ছয় মাস অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু বিএনপির অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ৬ আগস্ট যেন বিএনপিই ক্ষমতায় এসেছে।’
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঝালকাঠি জেলা শহরের ফায়ার সার্ভিস মোড়ের একটি রেস্তোরাঁয় জেলা এনসিপি আয়োজিত রাজনৈতিক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপির অংশগ্রহণ বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে সফরের অংশ হিসেবে ঝালকাঠিতে এই রাজনৈতিক কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
সারজিস আলম বলেন, ‘আমরা যখন এসবের প্রতিবাদ করছি, তখন আমাদের সহযোদ্ধাদের চোখ রড দিয়ে পিটিয়ে নষ্ট করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সংসদেও যখন আমাদের ঠিকমতো কথা বলতে দেয়া হচ্ছে না, তখন মনে করছি রাজপথে জনগণকে সাথে নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে হবে। সেই লক্ষ্যে আমরা লংমার্চ শুরু করেছি।‘
তিনি বলেন, ‘ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের শান্তিপূর্ণ লংমার্চের সমালোচনা করার জায়গা পাচ্ছে না। হাজার হাজার মানুষের সম্পৃক্ততা দেখে তখন তারা লংমার্চকে লংড্রাইভ বলছে। একই প্রক্রিয়ায় বেগম খালেদা জিয়া লংমার্চ করেছিলেন। বেগম খালেদা জিয়ার লংমার্চ হলে আমাদেরটা কেন লংমার্চ হবে না? আর আমাদেরটা লংড্রাইভ হলে তারটা কেন লংড্রাইভ হবে না? আমাদের এ প্রশ্নটা তাদের কাছে।’
সরকারের অসঙ্গতি তুলে ধরে তিনি আরো বলেন, ‘একদিকে মানুষ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সহ্য করতে পারছে না, আরেকদিকে প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ করা হচ্ছে। থানা, ডিসি অফিসসহ প্রত্যেকটা জায়গায় কাজ করতে দলীয় সুপারিশ লাগে ঠিক আগের মতোই। যেখানে ন্যায্য বিচার পাবার কথা, সেখানে আপনি পাচ্ছেন না।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে সারজিস আলম বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে আমাদের মনে হচ্ছে, সরকার ছয় মাসের মধ্যে লাইনচ্যুত হয়ে গেছে। ছয় মাস পার হওয়ার পর এখন এমপিরা বলছে শিশু সরকার। ছয় মাসে যদি শিশু থাকেন, পাঁচ বছরের মধ্যে কবে আপনি কিশোর হবেন, কবে তরুণ হবেন, কবে যুবক হবেন আর কবে বয়োবৃদ্ধ হবেন? সেটা আমাদের বললে আমরা সেই অনুযায়ী প্রশ্ন করব। কিন্তু আমরা দেখছি, সরকার নিজের দোষ স্বীকার করছেই না।’
সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘সরকারের জায়গা থেকে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতার জায়গা হচ্ছে তাদের মনস্তাত্বিক চিন্তা। সেই চিন্তাটা হলো পুরানো সময়ে যে চিন্তায় তারা রাজনীতি করেছে, ওই একই চিন্তা। কিভাবে তারা সব জায়গায় নিজেদের লোক ভরবে, সে যোগ্য হোক আর অযোগ্য হোক, সেই চিন্তা। তারা চিন্তা করছে কিভাবে সমাজে তাদের প্রভাব খাটানো যাবে, সেটা ভালো হোক, আর খারাপ হোক। তারা চিন্তা করছে কিভাবে অল্প সময়ে তাদের আখের গোছানো যাবে, এতে কোনো একটা সিস্টেম ভালোভাবে চলুক আর না চলুক।’
আমলাতান্ত্রিক বিষয়ে তিনি আরো বলেন, ‘ইউএনও-ডিসিরা কেউ কেউ বিএনপির ইউএনও-ডিসি হয়ে উঠেছে। আবার যারা পেশাদার হতে যাচ্ছে, তাদের গালিগালাজ করা হচ্ছে, ধমক দেয়া হচ্ছে, ট্রান্সফার করা হচ্ছে। যখন এভাবে একটা ভালো পদে যাবার যোগ্যতা হয় দলীয় আনুগত্য, তখন তো সরকার ভালোভাবে চলবে না।’
এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘একটা একটা করে সমস্যার সমাধান করা খুবই কঠিন, কারণ এতো সমস্যা বিএনপি তৈরি করে রেখেছে যা এভাবে সমাধান করা যাবে না। কিন্তু যদি সিস্টেমগুলো ঠিক হয়, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হয়, আমরা যদি দেখি প্রত্যেকটা জায়গায় যোগ্য লোকদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে, তাহলে ধীরে ধীরে এই সিস্টেমগুলো ঠিক হবে। কিন্তু সেই লক্ষণ আমরা বিএনপির মধ্যে দেখতে পাচ্ছি না। এ কারণে বিএনপি বিরোধীদলকে বাধ্য করেছে সংসদ ছেড়ে রাজপথে নামতে।’
তিনি বলেন, ‘তারা ব্যর্থতার দায়ভার স্বীকার না করে বিরোধীদলের ওপর চাপাচ্ছে। এমনকি তারা আমাদের শেখাচ্ছে কিভাবে কর্মসূচি করতে হয়। যে বিএনপি নিজে বিরোধীদল হিসেবে ব্যর্থ ছিল, যে বিএনপি মার্চ ফর ডেমোক্রেসির জন্য একটা ট্রাক সরাতে পারেনি, তাদের কাছ থেকে কিভাবে কর্মসূচি করতে হবে সেই নছিহত আমরা নেব না।’
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘সরকারি দল হিসেবে এখনো ন্যূনতম যতটুকু আস্থা মানুষের আছে সেটা যেন শূন্যের কোঠায় না নেমে আসে। এজন্য সঠিক পথে থাকতে হবে, জনগণের জন্য কাজ করতে হবে।’
সারজিস আলম বলেন, ‘জনগণকে যদি কার্ড দিতে হয় তাহলে গ্যাস সঙ্কটের কারণে জ্বালানি কাঠ দেন, বিদ্যুত ব্যবহারের জন্য বিদ্যুৎ কার্ড দেন, সার সঙ্কট দূরীকরণে কৃষককে সারের কার্ড দেন। দলীয় পুনর্বাসনের জন্য কার্ড প্রথা বন্ধ করে সাধারণ নাগরিকদের উন্নয়নের কথা চিন্তা করুন।’
তিনি আরো বলেন, ‘আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপি এককভাবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রতিটি ইউনিয়নে আমাদের প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। আমরা সে লক্ষ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরো জোরদার ও গতিশীল করার জন্য তৃণমূলে সাংগঠনিক সফর ও রাজনৈতিক কর্মশালা বাস্তবায়ন করছি।’
এনসিপির ঝালকাঠি জেলা শাখার সদস্য সচিব জুবায়ের হাওলাদারের সভাপতিত্বে এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) ডা: মাহমুদা আলম মিতু, যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার, যুগ্ম সদস্য সচিব শামীম হামিদী, যুগ্ম আহ্বায়ক ও বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন, জুলাই যোদ্ধা ও ঢাবির আলোচিত শিক্ষার্থী মহিউদ্দিন রনি।



