রুহিয়া (ঠাকুরগাঁও) সংবাদদাতা
ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়াবাসীর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নের বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়ে অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে নবগঠিত রুহিয়া উপজেলার অস্থায়ী প্রশাসনিক কার্যালয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে।
বুধবার (৩ জুন) দুপুরে রুহিয়া ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে ফিতা কেটে এবং রঙিন বেলুন উড়িয়ে এই নতুন কার্যালয়ের শুভ সূচনা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব এবং বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
কার্যালয় উদ্বোধনের পরপরই রুহিয়া ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নবগঠিত এই উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রমের সার্বিক সাফল্য, এলাকার উন্নয়ন এবং দেশের শান্তি-সমৃদ্ধি কামনা করে এক বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করা হয়। মোনাজাতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ উপস্থিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুধীজন এবং শত শত সাধারণ মানুষ অংশ নেন।
নবগঠিত রুহিয়া উপজেলার এই প্রশাসনিক যাত্রা শুরুর মুহূর্তে উপস্থিত ছিলেন নবনিযুক্ত রুহিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাইরুল ইসলাম। তিনি নতুন উপজেলার অস্থায়ী কার্যালয়ের প্রশাসনিক অবকাঠামো ও ভবিষ্যৎ দাফতরিক রূপরেখা তদারকি করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইউএনও ছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দফতরের কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। নতুন প্রশাসনিক অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষা ও নাগরিক সেবা দ্রুত নিশ্চিতকরণে প্রশাসনের এই কার্যকর উপস্থিতি পুরো আয়োজনে একটি প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা দান করে।
অস্থায়ী প্রশাসনিক কার্যালয় উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে রুহিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের বিশাল মাঠে এক বর্ণাঢ্য গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মাঠের চারপাশ নানা রঙের ব্যানার, ফেস্টুন এবং তোরণ দিয়ে সাজানো হয়। দুপুরের তীব্র রোদ ও গরম উপেক্ষা করে সকাল থেকেই উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাঠে এসে সমবেত হতে থাকেন।
দুপুরের মধ্যেই রুহিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
এই ঐতিহাসিক সংবর্ধনা সভায় ঠাকুরগাঁও জেলা ও রুহিয়া উপজেলার শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সভায় উপস্থিত ছিলেন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন, সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী, রুহিয়া উপজেলা বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক আব্দুল জব্বার এবং সদস্য সচিব জহিরুল ইসলাম।
এছাড়াও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রুহিয়া উপজেলা নেতৃবৃন্দ, রুহিয়া উপজেলা প্রেসক্লাব, স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক প্রতিনিধি, এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিত্ব, ব্যবসায়ী, সমাজসেবক এবং সর্বস্তরের সাধারণ নাগরিকবৃন্দ এই আয়োজনে শামিল হন।
আয়োজনের শুরুতেই প্রধান অতিথি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবর্ধনা মঞ্চে আসন গ্রহণ করলে স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের পক্ষ থেকে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রুহিয়া উপজেলা বাস্তবায়নের এই আনন্দক্ষণকে স্মরণীয় করে তুলতে স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীদের উদ্যোগে একটি দলীয় নৃত্য পরিবেশন করা হয়।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্ব ছিল প্রধান অতিথিকে সম্মাননা ক্রেস্ট ও শ্রদ্ধা স্মারক প্রদান। রুহিয়া উপজেলা গঠনে এবং এই অঞ্চলের মানুষের অধিকার আদায়ে তার অনবদ্য অবদানকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে রুহিয়া উপজেলা প্রেসক্লাব এবং স্থানীয় শিক্ষক প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে মঞ্চে তার হাতে বিশেষ সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।
সংবর্ধনা সভায় প্রধান অভিন্যের বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। তিনি তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী, রুহিয়ার অবিসংবাদিত নেতা মরহুম তৈমুর রহমানসহ এই অঞ্চলের সাবেক প্রয়াত নেতাদের সংগ্রাম ও ত্যাগের কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।
‘তৈমুর রহমান সাহেব ছিলেন আমার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম প্রধান এবং সবচেয়ে কাছের সহযোদ্ধা। আমরা একসাথে এই অঞ্চলের অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য কাজ শুরু করেছিলাম। আজ রুহিয়াবাসীর এই ঐতিহাসিক ও আনন্দের দিনে, তাদের স্বপ্ন পূরণের দিনে তাকে পাশে না পাওয়া অত্যন্ত বেদনার ও কষ্টের।’ রুহিয়ার সকল প্রয়াত নেতাকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বক্তব্যের শেষভাগে বিএনপি মহাসচিব দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুনির্দিষ্ট বার্তা ও দিকনির্দেশনা উপস্থিত জনসাধারণের সামনে তুলে ধরেন এবং দেশের চলমান সঙ্কট মোকাবিলায় ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
নবগঠিত রুহিয়া উপজেলাকে একটি আধুনিক, দুর্নীতিমুক্ত ও জনবান্ধব আদর্শ প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি স্থানীয় তরুণ সমাজকে মাদকমুক্ত থাকার এবং পড়াশোনার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার তাগিদ দেন।



