ময়মনসিংহ রেলপথে নৈরাজ্য, ইঞ্জিন নষ্ট–আগুন–লাইনচ্যুতি

রেল কর্মকর্তাদের মতে, পুরোনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন এবং দুর্বল রেললাইনই এসব সমস্যার মূল কারণ। বেশির ভাগ ইঞ্জিন দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে অতিরিক্ত গরম হয়ে মাঝপথে নষ্ট হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ মেরামতের আগেই ইঞ্জিন পুনরায় চলাচলে নামানো হচ্ছে।

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম, ময়মনসিংহ

Location :

Mymensingh
সবুজ প্রান্তরে ছুটে চলা নীল ইঞ্জিনের ট্রেন
সবুজ প্রান্তরে ছুটে চলা নীল ইঞ্জিনের ট্রেন |সংগৃহীত

ঢাকা–ময়মনসিংহ–জামালপুর রেলপথ বর্তমানে যেন এক চলমান ঝুঁকির প্রতিচ্ছবি। চলন্ত ট্রেনে ইঞ্জিনে আগুন, মাঝপথে নষ্ট হওয়া, সংযোগ হুক ভেঙে ইঞ্জিন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া কিংবা লাইনচ্যুতির মতো ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এর ফলে সময়সূচি ভেঙে পড়ছে এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থেকে যাত্রীরা পড়ছেন ভয়াবহ দুর্ভোগে।

রেলওয়ের তথ্যানুযায়ী, চলতি জুন মাসেই দু’টি ট্রেন লাইনচ্যুত এবং তিনটি ইঞ্জিন নষ্ট হয়েছে। মে মাসে আটটি এবং এপ্রিল মাসে ছয়টি ইঞ্জিন নষ্ট হয়। ধারাবাহিক এসব ঘটনা স্পষ্ট করে যে রেলপথটি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

গত সোমবার গফরগাঁও এলাকায় আন্তনগর জামালপুর এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন ও বগির সংযোগ হুক ভেঙে ট্রেনটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এতে প্রায় দুই ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। একই দিনে ঈশ্বরগঞ্জের আঠারবাড়ি এলাকায় বিজয় এক্সপ্রেসের ইঞ্জিনে আগুন লাগে। বিকল্প ইঞ্জিন সংযোজনের পর সেটিও নষ্ট হয়ে পড়ায় ওইদিন ট্রেন বাতিল করতে হয়—যা রেল ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

এর আগে, গত শনিবার তিস্তা এক্সপ্রেসের এসি কোচে আগুন এবং বুধবার ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেসের পাওয়ার কার লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এমনকি উদ্ধার অভিযানে নিয়োজিত উদ্ধারকারী ট্রেনও লাইনচ্যুত হয়, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরো প্রকট করে।

রেল কর্মকর্তাদের মতে, পুরোনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন এবং দুর্বল রেললাইনই এসব সমস্যার মূল কারণ। বেশির ভাগ ইঞ্জিন দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে অতিরিক্ত গরম হয়ে মাঝপথে নষ্ট হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ মেরামতের আগেই ইঞ্জিন পুনরায় চলাচলে নামানো হচ্ছে।

অন্যদিকে রেললাইনে পাথর, স্লিপার ও নাট–বল্টুর ঘাটতি প্রকট। ফলে নির্ধারিত গতিতে ট্রেন চলাচল করলেই ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা যাত্রী নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।

এই রুটে ১৮ জোড়া ট্রেন চলাচলের কথা থাকলেও ইঞ্জিন ও কোচ সঙ্কটের কারণে একাধিক ট্রেন বন্ধ রয়েছে। এটি শুধু অব্যবস্থাপনার নয়, বরং পরিকল্পনার ঘাটতিরও প্রতিফলন।

ময়মনসিংহ লোকোশেডের পরিদর্শক শফিউল হাসান জানান, চলতি মাসে তিনটি, গত মাসে আটটি এবং তার আগের মাসে পাঁচটি ট্রেনের ইঞ্জিন নষ্ট হয়েছে।

তিনি বলেন, পুরোনো ইঞ্জিন ও দুর্বল রেলপথের কারণে নির্ধারিত গতিতে ট্রেন চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। রেলপথ সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগে একাধিকবার চিঠি দেয়া হয়েছে।

রেলওয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসান বলেন, লাইনচ্যুতির ঘটনা তুলনামূলক কম হলেও নিয়মিত ইঞ্জিন নষ্টের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বেশির ভাগ ইঞ্জিন মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় নতুন ইঞ্জিন সংযোজন জরুরি। পাশাপাশি শ্রীপুর থেকে ময়মনসিংহ হয়ে বিদ্যাগঞ্জ, গৌরীপুর, আঠারবাড়ি, মোহনগঞ্জ ও জারিয়া পর্যন্ত রেলপথ দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন।

স্টেশন সুপার আবদুল্লাহ আল হারুন বলেন, ইঞ্জিন নষ্টের কারণে যাত্রীরাই সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন। এ সমস্যা সমাধানে নতুন ইঞ্জিন সংযোজন ও রেলপথ সংস্কারের বিকল্প নেই।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মনে করে, দীর্ঘদিনের অবহেলা, অদক্ষতা ও সিন্ডিকেটের কারণে রেলখাতের উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, পাথর সরবরাহে ঘাটতি এবং আধুনিকায়নের অভাবে পুরো রেলব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবেলায় তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে নতুন ও আধুনিক ইঞ্জিন সংযোজন, পূর্ণাঙ্গ রুট সংস্কার, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যকর মনিটরিং, ইঞ্জিন মেরামতে মান নিয়ন্ত্রণ এবং দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ।

দেশের অন্যতম নিরাপদ পরিবহন হিসেবে পরিচিত রেলব্যবস্থা আজ অবহেলা ও অদক্ষতার শিকার। প্রতিদিনের ইঞ্জিন নষ্ট, আগুন ও লাইনচ্যুতি কেবল দুর্ভোগই নয়—বরং বড় ধরনের দুর্ঘটনার পূর্বাভাসও হতে পারে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে, এই রেলপথ এক সময় ‘দুর্যোগের রুট’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠতে পারে—এ আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না।