সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া পর্যন্ত সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প আগামী সপ্তাহে একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হচ্ছে। একইসাথে বগুড়া বায়তুর রহমান সেন্ট্রাল মসজিদের পূর্ণাঙ্গ নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে প্রায় ২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই মসজিদের কাজের দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বান করা হবে।
শুক্রবার (১২ জুন) বগুড়া প্রেস ক্লাবে স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য জানান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
সভায় তিনি বগুড়ার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা ও বিশেষ উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে সাড় ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে সিরাজগঞ্জ-বগুড়া ডুয়েলগেজ রেলপথ প্রকল্পটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। এই প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ইতিমধ্যে সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া জেলা প্রশাসনের কাছে ২২০০ কোটি টাকা হস্তান্তর করা হয়েছে এবং অধিগ্রহণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। দাতা সংস্থার যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা মেনে আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে এই রেলপথের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।
বগুড়া শহরের ভেতর দিয়ে যাওয়া রেললাইন নিয়ে চলমান আলোচনা-সমালোচনা প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘শহরের যানজট ও ভোগান্তি দূর করতে আমরা নতুন একটি সম্ভাব্যতা যাচাই করছি। পরিকল্পনা রয়েছে, রানীরহাট থেকে বগুড়া শহরে যে রেল সংযোগ আসবে, সেখান থেকে ঢাকা মেট্রোরেলের আদলে উড়াল রেললাইন বা পিলার তৈরি করে শহরের ওপর দিয়ে ট্রেনটিকে নিয়ে গিয়ে গাবতলীতে নামানো হবে। এতে বগুড়া রেল স্টেশনটি মেট্রো রেলের মতো দোতলায় হবে, শহরে কোনো রেলগেট থাকবে না এবং নিচের অংশটি রাস্তা হিসেবে সিটি করপোরেশন ব্যবহার করতে পারবে। আগামী সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে বলে তিনি জানান।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী বগুড়া বায়তুর রহমান সেন্ট্রাল মসজিদের উন্নয়ন ও পূর্ণাঙ্গ নির্মাণকাজের জন্য প্রায় ২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। দ্রুতই ঠিকাদার নিয়োগ করে এর কাজ শুরু হবে। এছাড়া শহরের সৌন্দর্যবর্ধন এবং বিভিন্ন চত্বর সংস্কারের যাবতীয় কাজ নবগঠিত সিটি করপোরেশনের অধীনে সম্পন্ন করা হবে। এই মুহূর্তে রাস্তাঘাট ভাঙচুর না করে বিদ্যমান অবকাঠামো ঠিক রেখেই পানি নিষ্কাশন ও চলাচলের পথ সুন্দর করার কাজ চলছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
বগুড়ার তরুণ সমাজের মাদকাসক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত ১৯ বছর বগুড়ার ছেলে-মেয়েরা তেমন কোনো চাকরির সুযোগ পায়নি। দীর্ঘদিনের এই হতাশা থেকেই অনেকে মাদকের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বর্তমানে সরকারি বিভিন্ন দফতরে প্রায় ৫ লাখ শূন্যপদ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বেকার যুবসমাজকে আবেদনের আহ্বান জানান। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে থাকা বগুড়ার কৃতি সন্তানদের সাথে সমন্বয় করার পরামর্শ দেন তিনি।
মাদক নির্মূলের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আমি বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নিয়েছি। বগুড়ার পুলিশ সুপার এবং জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলে দ্রুত সেখানে বিশেষ অভিযান শুরু করা হবে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করা হবে ইনশাআল্লাহ।’
বগুড়াবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইনটি সংশোধন করে একটি পূর্ণাঙ্গ সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় করার কাজ চলছে। নতুন নামকরণে এটি ‘বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে সংসদে পাস করা হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে বগুড়ায় যাতে আলাদা কৃষি, প্রকৌশল বা চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় না লাগে, সেজন্য এই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেই জেনারেল অনুষদের পাশাপাশি প্রকৌশল, কৃষি ও চিকিৎসা অনুষদ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এখানে পিএইচডি ও দেশী-বিদেশী গবেষকদের জন্য বিশেষ গবেষণার সুযোগ থাকবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আইনটি চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং আগামী সপ্তাহে এটি মন্ত্রিপরিষদে উঠবে। বিশ্ববিদ্যালয়টি শহরের কোলাহলমুক্ত কোনো প্রাকৃতিক পরিবেশে স্থাপন করা হবে।
বগুড়া বিমানবন্দরটি সাধারণ অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর হিসেবে চালু হওয়ার কথা থাকলেও এখন তা আধুনিক ও বহুমুখী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। এখানে মোট ৬টি বিশেষ সুবিধা থাকবে, যার মধ্যে ডমেস্টিক ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের পাশাপাশি কার্গো সুবিধা এবং বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধঘাঁটি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। দেশের এই চতুর্থ বা পঞ্চম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহরে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সংযুক্ত হবে। এছাড়া এখানে দেশের প্রথম বেসরকারি পাইলট ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে সাধারণ পরিবারের সন্তানরাও পাইলট হওয়ার প্রশিক্ষণ নিতে পারবে। উত্তর অঞ্চলের উদ্বৃত্ত কৃষিপণ্য সরাসরি বিদেশে রপ্তানির জন্য এখানে কার্গো সুবিধা বিশেষভাবে ভূমিকা রাখবে।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের কার্যপরিধি ও নগর পরিকল্পনাকে সুবিন্যস্ত করতে রাজধানী বা রাজশাহীর আদলে ‘বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ (বউক) গঠন করা হচ্ছে, যার খসড়া আইনের কাজ চলছে। এটি নতুন আবাসিক এলাকা নির্মাণ ও ভবনের নকশা অনুমোদনে ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি শহরের সুপেয় পানি ও আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন ‘বগুড়া ওয়াসা’ স্থাপন করা হচ্ছে।
বগুড়া শহরের গুরুত্ব বাড়াতে গাবতলীতে একটি ফোর-লেন বাইপাস সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া শহরের চারমাথা থেকে নওগাঁ পর্যন্ত রাস্তাটি যার মধ্যে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থাকবে সেটিকে ৬ লেনে এবং মোকামতলা থেকে জয়পুরহাটের হিলি পর্যন্ত রাস্তাটি সার্ভিস লেনসহ ৪ লেনে উন্নীত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
মতবিনিময় সভায় প্রতিমন্ত্রী বগুড়া প্রেস ক্লাবের অভ্যন্তরীণ ডেকোরেশন, রাস্তা ও এসিসহ সার্বিক সংস্কারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ১ কোটি টাকা অনুদান ঘোষণা করেন, যা সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে। একইসাথে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমে প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির খবরের তীব্র প্রতিবাদ জানান তিনি।
গাবতলীর বাগবাড়ী সড়কের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ওই এলাকায় যাওয়ার সময় রাস্তাটি কাঁচা ও চলাচলের অনুপযোগী ছিল। বৃষ্টির সম্ভাবনা মাথায় রেখে স্থানীয় প্রশাসন জরুরি ভিত্তিতে সাময়িকভাবে ইট ভাড়া করে সেখানে বিছিয়ে দিয়েছিল। এখন অনুমোদিত ঠিকাদার মূল কাজ বালু ভরাট, ডব্লিউবিএম ও কার্পেটিং শুরু করায় সেই ভাড়া করা ইট মালিককে ফেরত দেয়া হয়েছে। এর সাথে প্রতিমন্ত্রীর দুর্নীতির কোনো সম্পর্ক নেই।’
তিনি সাংবাদিকদের যেকোনো সংবাদ প্রকাশের আগে সঠিক তথ্য-উপাত্ত যাচাই করার বিনীত অনুরোধ জানান।
বগুড়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি রেজাউল হাসান রানুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভা সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক কালাম আজাদ। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন। সাংবাদিক ইউনিয়ন বগুড়া’র সভাপতি গনেশ দাস, সাধারণ সম্পাদক এস এম আবু সাঈদসহ সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন মিডিয়ার সংবাদকর্মীরা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সভার শুরুতে প্রতিমন্ত্রীকে বগুড়া প্রেস ক্লাব ও সাংবাদিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়।



